Sunday, May 24, 2020

দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে


কাজটা করতে হবে খুব সাবধানে। সবার একদম অগোচরে, যেন কাকপক্ষীও টের না পায়।
কথাটা ভাবতে ভাবতে সদরুলের আধখাওয়া সিগ্রেটের ধূসর ছাই সন্তর্পণে আশ্রয় নিতে থাকে ছাইদানিতে। ‘কাকপক্ষী’ কথাটা অবশ্য সে সেভাবে ভাবেনি, অনেকটা চিন্তার টানেই এসে পড়েছে। এই ঢাকা শহরে আজকাল চড়ুইয়ের দেখা মেলাটাই কঠিন, আর সেখানে পক্ষী! ভূতের গলির আট তলার ছাদের কার্নিশে কোনোদিন কাক দেখেছে বলেও মনে পড়ে না তার। আচ্ছা, ঢাকা শহর থেকে কাকেরা সব উধাও হয়ে গেল নাকি? এরই নাম কি তাহলে কাকস্য পরিবেদনা?
কী অদ্ভুত, একটা ভয়ংকর কাজ করার আগেও সদরুলের করোটিতে এসব হাস্যকর ভাবনা ঘাঁই দিয়ে বেড়াচ্ছে। অনেক দিন ধরে ব্যাপারটা নিয়ে সে ভাবছে। তবে কাজটার ধরন এমন, অনেকে ভাবলেও শেষ পর্যন্ত প্রায় কেউই সাহস সঞ্চয় করে উঠতে পারে না। আবার কেউ আছে চেষ্টা করতে গিয়েও পারে না, পরে কেলেঙ্কারির একশেষ। আর কয়েকজন যারা শেষ পর্যন্ত পেরে যায়, তাদের ধরনটা ঠিক সদরুলের পছন্দ নয়। তার দরকার অভিনব একটা উপায়, যেটা কেউ আগে ভাবেনি। সবচেয়ে ভালো হয়, ‘খুনটা’ ‘দুর্ঘটনা’ হিসেবে চালিয়ে দিতে পারলে। কিন্তু সেরকম কি কোনো উপায় আছে? নিজেকে কীভাবে খুন করলে সেটা ঠিক ঠিক একটা দুর্ঘটনার মতো দেখাবে?

‘আত্মহত্যা’ শব্দটা সদরুলের ঠিক পছন্দ নয়। একটা সেকেলে ভাব আছে এতে, একটা ‘অপরাধ অপরাধ’ গন্ধও আছে। আর লেপ্টে আছে সামান্য একটু গ্লানি, সঙ্গে একটু অগৌরব। বরং ‘স্বেচ্ছা-প্রত্যাহার’ শব্দটা সদরুলের মনে ধরেছে বেশি। নিজেকে শেষ করে দেওয়ার যে প্রক্রিয়া, তাতে আদৌ কোনো অগৌরব আছে কি না সেটা নিয়েও প্রশ্ন আছে সদরুলের। অনেকের এই সিদ্ধান্তের পেছনে অনেক কারণ থাকে। কেউ ধারদেনায় ডুবে এই কাজ করে, কেউ প্রেমে ব্যর্থ হয়ে করে, আবার কেউ করে কেলেঙ্কারি থেকে। কারণ অবশ্য ঘুরেফিরে একটাই, ভালোবাসাহীনতা আর গভীর বিষাদ। এখন নাকি সেটার একটা গালভরা নামও হয়েছে, ‘ডিপ্রেশন’। সদরুলের অবশ্য সেই অর্থে ঠিক যৌক্তিক কোনো কারণ নেই। বাবা বহু আগেই মাকে ছেড়ে চলে গেছেন, পাঁচ বছর আগে মারা গেছেন মা-ও। এরপর প্রথম কয়েকটা মাস মনে হয়েছিল, কী লাভ বেঁচে থেকে? ভাই-বোনও ছিল না কেউ, কিন্তু সদরুল কিন্তু সামলে নিয়েছিল ধাক্কাটা। যে চাকুরি করত, তাতে নিজের ভরণপোষণের বাইরে চিন্তার সুযোগ খুব বেশি নেই, কাজেই একাকীত্বটা ঘোঁচানোর খুব একটা উপায়ও ছিল না। আর এমন কেউ নেইও, সদরুলকে এ নিয়ে তাগাদা দেবে। মা মারা যাওয়ার পর চারটা বছর কেটে গেছে একরকম নির্বিবাদেই। সমস্যা হয়েছে, গত কিছু দিনে। জীবনটা হঠাৎ করেই ভীষণ রকম একঘেয়ে হয়ে উঠেছে সদরুলের। নয়টা-পাঁচটা অফিসের বাইরে করারও নেই কিছু। একটা খেলা খুব করেই দরকার ছিল সদরুলের। নিজেকে শেষ করে দেওয়াটা তাই আর সব ‘স্বেচ্ছা-প্রত্যাহারের’ মতো নয় তার আছে, একটা শেষ পরীক্ষাও বটে। এই পরীক্ষায় তাকে পাশ করতেই হবে, তবে সেটা নকল করে করতে চায় না কোনোভাবেই।
কথাটা আবার ভাবে সদরুল। নিজেকে ঠিক কীভাবে শেষ করে দিলে সেটা একটা চমৎকার দুর্ঘটনার মতো দেখাবে? জীবনানন্দ দাশ হঠাৎ সদরুলের ধূসর নিউরনে টোকা দিয়ে যান। কলকাতার ব্যস্ত রাস্তায় ট্রামের নিচে পড়ে কেউ মরবে, সেটাও কি সম্ভব? জীবনানন্দের সেই মৃত্যু দুর্ঘটনা হিসেবেই দেখা হয়ে আসছে, যদিও সদরুল জানে সেটা নিখুঁত পরিকল্পনা করে সাজানো একটা ‘স্বেচ্ছা-প্রত্যাহার’। নইলে ‘যখন ডুবে গিয়েছে পঞ্চমীর চাঁদ, মরিবার হলো তার সাধের’ মতো বাক্য তিনি লিখবেন কেন? মাল্যবান বা কারুবাসনা উপন্যাসে নিজের প্রাণহননের অমন স্পষ্ট ইঙ্গিতই বা দেবেন কেন? সদরুল এসব নিছক কাকতাল বলে মানতে রাজি নন মোটেই। তবে এটা ঠিক, জীবনানন্দের মতো ট্রামের তলার মৃত্যুটা ঠিক মেনে নিতে পারে না। জীবনানন্দের আগে পরে কলকাতায় আর কেউ ট্রাম দুর্ঘটনাতেই মরেনি, তাতে যে কবি মরবেনই এমন কোনো গ্যারান্টি তো ছিল না? জেনেশুনে এমন ভুল তো সদরুল করতে পারে না। তার মৃত্যু হবে সুনিশ্চিত, তাতে ব্যর্থতার কোনো জায়গা থাকবে না।
প্রথাগত উপায়গুলো রোমান্টিক নয় বলে অনেক আগেই বাদ দিয়েছে সদরুল। হাত কেটে মরা? নাহ, তাতে রক্তপাত অনেক বেশি। সদরুল দুর্বলচিত্তের মানুষ, রক্তপাত সে সইতে পারে না। বিষ জোগাড় করা সহজ, কিন্তু স্বেচ্ছা-প্রত্যাহারের জন্য সেটা খুবই অনিশ্চিত একটা উপায়। আর তাতে বেঁচে গেলেও কষ্টের একশেষ।  একটা পিস্তল পেলে অবশ্য এক মুহূর্তে কাজ হয়ে যেত, আর মাথায় গুলি করলে হাজার বারের মধ্যে মরার সম্ভাবনা ৯৯৯ বার। কিন্তু সদরুল কারও সাতে পাঁচে না থাকা মানুষ, সে পিস্তল পাবে কোথায়? হেমিংওয়ে হওয়ার ইচ্ছা থাকলেও তাই হয়ে ওঠে না তার। পানিতে মরা একটা উপায় হতে পারে, কিন্তু সদরুল শুনেছে তাতে কষ্ট অনেক বেশি। তার নয়তলা বিল্ডিং থেকে লাফিয়ে পড়লেও হয়, অথবা বাজার থেকে দড়ি কিনে এনে নেওয়া যায় ফাঁস। কিন্তু এসব তো করবে যারা হতাশা থেকে আত্মহত্যা করে! সদরুলের দরকার একদম নতুন কোনো উপায়, যাতে সেটা স্বেচ্ছা-প্রত্যাহার বলেই বোঝা না যায়।
সেই নতুন উপায় কী হতে পারে? দুর্ঘটনা হিসেবে চালিয়ে দিতে চাইলে একটা সহজ উপায় আছে, সোজা গিয়ে ১২ নম্বর বাসের তলায় লাফিয়ে পড়লেও হয়। আজকাল ঢাকা শহরের এমন অবস্থা, বাসের নিচে প্রতিদিন একজন মারা না পড়লে টিভি-পত্রিকাও কেমন যেন পানসে লাগে। সদরুলের বাবা-মা থাকলে অবশ্য সুবিধা হতো, দুর্ঘটনায় মরলে পাওয়া যেত নগদ বেশ কিছু টাকা। আর মরাটা একটু বীভৎস আর একটু জনাকীর্ণ জায়গায়  হলে হয়তো একটা গলি বা নিদেনপক্ষে ফুটওভার ব্রিজও তার নামে হতে পারে। সদরুলের মতো একজন প্রায় বিশেষত্বহীন মানুষের জন্য সেটাও বা কম কীসে? কিন্তু সদরুল এই ভাবনাটা দুইটি কারণে ঠিক বরদাশত করতে পারে না। প্রথমত, বাসের নিচে লাফ দিলেই যে পড়বেই সেটার একশতভাগ গ্যারান্টি দেওয়া যায় না। কোনো কারণে হতচ্ছাড়া ড্রাইভার ব্রেক কষে ফেললেই শেষ। তার চেয়ে বরং ট্রেনের নিচে লাফিয়ে পড়া ভালো, তাতেই সেই সংশয় নেই। কিন্তু সেটা তো দুর্ঘটনা হিসেবে চালানো কঠিন, বরং সেই ‘আত্মহত্যা’ বলেই খবরের কাগজের পাঁচ নম্বর পাতায় সিঙ্গেল কলামে ১০০ শব্দ ছাপা হবে। আর তার চেয়েও বড় কথা, বাসের নিচে লাফিয়ে পড়লে খেলাটা তো ঠিক জমে না।
সদরুল ভাবে, বাংলাদেশে জাপানের আওকিগাহারার মতো একটা স্বেচ্ছা-প্রত্যাহারের অভয়ারণ্য থাকলে বেশ হতো। বনভোজন করার নামে সেখানে লেগে যেত মৃত্যুর মচ্ছব, একটা না একটা উপায় মিলতোই। কেউ বিষ খেয়ে নীল হয়ে আছে, কেউ গাছের সঙ্গে দড়ি বেঁধে ঝুলে পড়েছে বা কেউ বনের কিনারে জলাশয়ে ডুব দিয়ে আত্মঘাতী হয়েছে; যার যেমন ইচ্ছা। অনেক বছর ধরে অবশ্য সরকার এখানে ওখানে ‘জীবন নিজের হাতে তুলে দেবেন না’ সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে রেখে দিচ্ছে, তবে তাতে কাজ হচ্ছে কই? মৃত্যুও যে একটা উৎসব, সেটা জাপানিদের চেয়ে ভালো আর কে-ই বা বুঝেছে? তবে সেই যুগ এখন আর নেই, আজকাল নির্বিবাদে নিজের মতো মরাও অনেক বড় হ্যাপা।

এক জায়গায় অবশ্য সদরুল সেদিন ভালো একটা আইডিয়া পেয়েছিল। একটা নির্দিষ্ট মা্ত্রার চেয়ে বেশি নয়-দশটি ইনসুলিন ভরা ইনজেকশন নিলেই নিশ্চিত মৃত্যুর কাছাকাছি চলে যাওয়া যাবে। সদরুলের খারাপ লাগেনি, উপায়টা একটু নতুনই মনে হয়েছে। কিন্তু তাতে তো তার আসল উদ্দেশ্য মার খেয়ে যাচ্ছে। তার ওপর কোনো সুইসাইড নোটও যখন পাওয়া যাবে না, সেটা দুর্ঘটনা হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার সম্ভাবনাই প্রচুর।
কিন্তু সদরুলের পরিকল্পনা একেবারেই আলাদা। টিভিতে বা পত্রিকায় কোনোভাবেই যেন ‘আত্মহত্যা’ বলে চালিয়ে দিতে না পারে। তার একাকীত্ব জীবনের সঙ্গে হতাশা-টতাশা মিলিয়ে গল্পটা ভালোই ফেঁদে বসতে পারেন সাংবাদিকেরা, সেটা সে জানে। ভাগ্য আরেকটু ভালো হলে কাউন্সেলিংয়ের অভাবে আত্মহত্যার সংখ্যা ইদানীং কেন বেড়ে যাচ্ছে, সেটা নিয়েও হয়তো এক দুই লাইন লেখা হবে। সদরুল অবশ্য এসবের কাউন্সেলিং-ফাউন্সেলিংয়ের উর্ধ্বে চলে উঠেছে অনেক আগেই। তার মধ্যে ওসব হতাশা বা বিষাদও কাজ করে না বহু আগে থেকে। বেঁচে থাকার অর্থ সে খুঁজে পায় না বটে, তবে সেটা তো আরও কত লোকই পায় না। কিন্তু ‘স্বেচ্ছা প্রত্যাহারের’ চিন্তা তো সবাই করে না। বা করলেও সাহস করতে পারে না। সদরুলের এসব নিয়ে কোনো ভাবাবেগ নেই। সে জানে, আগামী পাঁচ বছরেও তার প্রতিটি সকাল আর প্রতিটি সন্ধ্যা একই রকম কাটবে। তার ঘড়ির কাঁটার বাইরে এক মুহূর্তও কোনো কিছু এদিক সেদিক হয় না, বেঁচে থাকতে হওয়ার সম্ভাবনাও নেই। ঠাণ্ডা মাথায় সে ভেবেছে, নিজেকে খুন করার খেলাটা খেলার তার জন্য এখন সবচেয়ে মোক্ষম সময়। সে জানে, তার ভাবনা একজন সাইকোপ্যাথের সঙ্গে অনেক খানি মিলে যায়। তবে চাইলে সে তর্ক করতে পারে, অন্যের ক্ষতি করার ইচ্ছা তার কখনোই নেই। আর সে রক্তপাত সহ্য করতে পারে না মোটেই। কেন তাকে খামাখা একজন সাইকোপ্যাথের অপবাদ নিতে হবে? তার চেয়ে ঠাণ্ডা মাথায় নিজেকে শেষ করে দেওয়ার একটা চমৎকার প্রক্রিয়া নিয়ে ভাবা যাক।
একবার সে ভাবে, এখানে দ্বিতীয় পক্ষকে জড়ালে কেমন হয়। কোথাও যেন পড়েছিল, এক লোক একবার ইচ্ছে করে গোক্ষুরের কামড় খেয়ে মারা গিয়েছিল। সাপটা এরকম দ্বিতীয় পক্ষ হতে পারে। কিন্তু ঢাকা শহরে সে বিষধর সাপ পাবে কোথায়? বিদ্যুচ্চমকের মতো তার মনে পড়ে যায়, নিজেকে খুন করানোর জন্য একজন পেশাদার খুনি ভাড়া করলে কেমন হয়? সদরুল একেবারেই নির্বিরোধী লোক, তাকে কে খুন করবে সেটা ভাবতে ভাবতেই জেরবার হয়ে যাবে পুলিশ। সে নিজেই টাকা দিয়ে কাউকে খুন করিয়েছে, সেটা ঘুণাক্ষরেও কেউ ভাবতে পারার কথা নয়। আর তাকে খুনের কোনো মোটিভও নেই কারও। পুলিশ খুনি ধরা দূরে থাক, সন্দেহ করার মতো কাউকে খুঁজে পেতেই ঘাম ছুটে যাবে। চিন্তা করেই একরকম পৈশাচিক আনন্দ হতে থাকে সদরুলের।
সমস্যা হচ্ছে, অন্ধকার জগতের সঙ্গে সদরুলের কোনো জানাশোনা নেই। সত্যি বলতে, তার সঙ্গে খুব কম লোকেরই পরিচয় আছে। এই ৩০ বছরের জীবনে তার বন্ধুও নেই তেমন, সহপাঠীদের সঙ্গেও ক্লাসের বাইরে আলাদা কোনো সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি কোনো। অফিসেও পেশাগত সম্পর্কের বাইরে কারও সঙ্গে বাড়তি হৃদ্যতা নেই। তবে পাড়ার দোকানে আজিজের কাছ থেকে সিগ্রেট কিনতে হয় বরং কিছুটা কথাবার্তা হয়। আজিজ একবার কথাচ্ছলে তাকে বলেছিল, ‘বুঝলেন ভাইজান, একটা কথা কই, কাউরে আবার কইয়েন না যেন। সেদিন রাত বারটায় দোকানডা মাত্র বন্ধ কইরা হুইয়া আসি, আইতকা নাম ধইরা চিক্কুর। খুইলা দেখি, রফিক ভাই ডাকে, আজিজ সিগ্রেট দে। আমি ঘুমের ঘোরে বেন্সন না গোল্লিপ দিসি হেই খেয়ালও নাই। পরের দিন হুনি, রফিক ভাইয়ের নাকি ‘ডিউটি’ ছিল আরেক জাগায়। এক দুইটা লাশ নামান দেওন কিন্তু তার কাছে ঘটনা না। হেইদিন তাদের কথা বার্তা হুইনা যা ঠাওর করলাম, এই কামই কইরা আসছিল।’
সদরুল এসব এসব পাত্তা দেয়নি। সে সিগ্রেটের ব্যাপারী, কালাশনিকভের খবর রেখে তার লাভ কী? তবে এখন মনে হচ্ছে, রাখলে খারাপ হতো না। সে মনে মনে প্লটটা সাজাতে শুরু করে। রফিককে বোঝানোটাই হবে এখানে সবচেয়ে কঠিন কাজ। প্রথমে সে সদরুলকে নির্ঘাত পাগল বলে ঠাওরাবে, হেসে উড়িয়ে দেবে। মেজাজ মর্জি খারাপ থাকলে এরকম ফালতু কথা বলার জন্য গায়ে হাত টাতও দিয়ে বসতে পারে। কিন্তু টাকার লোভটা কি রফিক এড়াতে পারবে? সদরুল একা মানুষ, টাকা নেই নেই করেও কিছু থেকে গেছে। আর মাও কিছু টাকা রেখে গিয়েছিলেন। সেই টাকা নিয়ে কী করবে, ভাবনাটা এক সময় বিস্তর ভুগিয়েছিল তাকে। কিন্তু আলস্য আর অবসাদে সে টাকাটা আর খরচই করতে পারেনি। এবার ভালো একটা সুযোগ পাওয়া গেছে। কিন্তু রফিক যদি টাকাটা নিয়ে কাজটা না করে? আর এখানে তো কাজ শেষে টাকা দেওয়ারও উপায় নেই। এমনও হতে পারে, অর্ধেক শুরুতে দিল আর অর্ধেক কাজ শেষের পরে। কিন্তু রফিক যদি না মেরে স্রেফ পায়ে একটা গুলি করে বাকি টাকা নিয়ে পালিয়ে যায়? মানুষ খুন করার দায় যদি সে নিতে না চায়? আর সদরুল যদি পুলিশের কাছে বলেও গুলিটা করার টাকা সে দিয়েছে সোজা তাকে মানসিক হাসপাতালে চালান করে দেবে পুলিশ। এখানে তাকে অনেক ‘যদি আর কিন্তুর’ ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, সদরুল ভাবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কাজটা করতে পারলে তার খেলাটা বেশ জমে।
এইসব ভাবতে ভাবতে সদরুল খেয়াল করে, সিগ্রেট শেষ হয়ে গেছে তার। আজিজের দোকানে যেতে হবে একবার। সিড়ি দিয়ে নামার সময়ও সে ভাবতে থাকে রফিকের কথা। আজিজকেই বা কথাটা কীভাবে বলবে? আনমনা থাকাতে খেয়াল করে না, মোড়টা হঠাৎ করে ভীষণ রকম শুনশান। লক্ষ্য করে না, দুই পাশে সাদা আর নীল মাইক্রোবাস থেকে অস্ত্র হাতে দুই দল অবস্থান নিয়ে রাস্তার দু ধারে। নিজের মৃত্যুসম্ভাবনা নিয়ে তুমুল ব্যস্ত থাকায় সদরুল দেখে না, নিঃশব্দ আততায়ীর মতো একটা বুলেট এসে ঠিক তার ঘাড় ফুটো করে বেরিয়ে যায়। নিজেকে খুন করার ভাবনাটা তাই কালচে রক্ত হয়ে জমাট বাঁধে শুকনো পিচের ওপর।
আর পরদিন সকালে ভোরের বাণীতে প্রথম পাতায় সংবাদ ছাপা হয়, ‘সন্ত্রাসীদের দুই পক্ষের গোলাগুলিতে ভুতের গলিতে সদরুল নামের একজন নিরীহ পথচারী মৃত। তার পরনে ছিল সবুজ শার্ট, নীল জিন্স। ধারণা করা হচ্ছে, এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে রফিক আর শওকত গ্রুপের দ্বন্দ্বের জেরেই প্রাণ হারান সদরুল। এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত শওকত ধরা পড়লেও রফিক পলাতক। পুলিশ এখন পর্যন্ত তাকে ধরতে পারেনি।’
কেউ দেখেনি, মর্গে বেওয়ারিশ পড়ে থাকা সদরুলের মুখে তখন এক চিলতে হাসি।


No comments:

অন্ধের স্পর্শের মতো চলে গেলেন শঙ্খ ঘোষ

 সব কবিদের গদ্য সুন্দর হয় না। কেউ কেউ আছেন যাদের দুই হাতে একসঙ্গে বাজে কবিতা আর গদ্যের যুগলবন্দি। শঙ্খ ঘোষের গদ্যই সত্যিকার অর্থে পড়েছিলাম আ...