Wednesday, August 19, 2015

রঙিন পর্দার গল্প

বনফুলের পাঠকের মৃত্যু নামে একটা ছোটগল্প আছে। কখনও কখনও মনে হয়, উল্টোটাও তো হতে পারে। ধরুন, যে বইটা অলস ফেলে রেখেছিলেন ঘরের এক কোণায়, এক পরত ধূলো জমেছিল যেটির ওপর, সেই বইটাই হয়তো আপনাকে মন্ত্রমুগ্ধের মতো বুঁদ করে রাখল। পেইন্টেড ভেইল ছবিটা দেখে মনে হলো, আমার ক্ষেত্রেও যেন সেটা হলো। একসময় যে ছবিটা শুধুই সিনেমাটোগ্রাফির জন্য ভালো লেগেছিল, সেটা আরেকবার দেখে মনে হলো, আসলে ছবিটার মর্ম তখন কিছুই ধরতে পারিনি। সেটার জন্য অনুভূতির তারগুলোও অবশ্য একটু চড়া সুরে বাঁধতে পারা চাই।

একদিক দিয়ে দেখলে ছবিতে আবেগের কিঞ্চিত বাড়াবাড়ি, সোজা বাংলায় যেটাকে বলা হয় মেলোড্রামাটিক, তার কমতি নেই। স্বৈরিণী স্ত্রীর স্বামীর সঙ্গে একরকম বনবাসে যাওয়া বাধ্য হয়েই, পরে আবার সেই স্বামীর বুকেই তার অশ্রু সমর্পণ। এটুকু হয়তো আদি ও অকৃত্রিম উপমহাদেশীয় অনেক ছবির কথাই মনে করিয়ে দেবে। কিন্তু যে প্রেক্ষাপটে বিরহ মধুরাতে মধুর হলো, সেটা না বুঝলে, আসলে ছবিটা দেখার স্বাদ ষোলআনা পাওয়া যাবে না।

বাবা-মাকে ছেড়ে যাওয়ার জন্য কিটি দুম করে তরুণ ডাক্তার ওয়াল্টারকে বিয়ে করে পাড়ি জমায় চীনে। কাঠখোট্টা স্বামী কখনোই কিটির মন বুঝতে পারেনি (উল্টদিকেও তাই)। খুব শিগগিরই সাংহাইতে বিবাহ-বহির্ভূত প্রণয়ে জড়িয়ে পড়ে কিটি। ওয়াল্টার সেটা টের পেয়ে যায়। এই পরিস্থিতিতে একজন মহৎহৃদয় স্বামীর কর্তব্যও সে পালন করে, স্ত্রীকে সুযোগ দেয় প্রেমিকের কাছে ছুটে যাওয়ার। কিন্তু কিটি মানুষ বুঝতে ভুল করেছিল, মোহটা খুব তাড়াতাড়িই কেটে যায়। ভগ্নমনোরথ হয়ে তাকে যেতে হয় স্বামীর সঙ্গে চীনের দুর্গম এক এলাকায়। সেখানে কলেরার প্রকোপে মানুষ মরছে দল বেঁধে। ওয়াল্টার অবশ্য জীবন বাঁচাতেই ব্যস্ত। স্ত্রীকে দূরে ঠেলে দিয়েছে আগেই, দুজনের সম্পর্কটাও নেহাতই আনুষ্ঠানিকতার। স্বামী-স্ত্রী এক ছাদের (আক্ষরিক অর্থে ধরে নিলে ভুল করবেন।) নিচে থেকেও তাদের মধ্যে দুস্তর পারাবার। কিটি সেটা কমিয়ে আনতে চাইলেও ওয়াল্টার অটল নিজের প্রতিজ্ঞায়। এরপর কীভাবে সেই দূরত্ব ঘুচল, এক দোঁহে মিলে গেল দুইটি প্রাণ সেটা পরের গল্প।



এর মধ্যে স্থানীয় একটা কনভেন্টে কিটি জড়িয়ে পড়ে শিশুদের সান্নিধ্যে। জীবনের নতুন মানে সে খুঁজে পায়, স্বামীকেও আবিষ্কার করে নতুনভাবে। স্বার্থপর, আত্মকেন্দ্রিক কিটির নতুন একটা রূপও খুঁজে পায় ওয়াল্টারের সামনে। বাকিটা গল্পটা তোলা থাক।

যেটা বলছিলাম, ওয়াল্টারের চরিত্রে নর্টন ছিলেন তাঁর মতোই দুর্দান্ত। তবে নতুন করে দেখে আমি মুগ্ধ হয়েছি নাওমি ওয়াটসে। একজন নারীর নিজের সাথে সংঘাত, বারবার আঘাত পাওয়া, হৃদয় দীর্ণ হওয়া- পশ্চিমা একজন অভিনেত্রীর জন্য খুব একটা সহজ কাজ ছিল না। নাওমি বোধহয় নিজের সেরা চেষ্টাটাই করেছেন। আর সিনেমাটোগ্রাফির কথা তো না বললেই নয়। চীনের অবারিত মাঠ, শান্ত সমাহিত সৌন্দর্য আমাদের চিরচেনা গ্রামগুলোর কথাই মনে করিয়ে দেবে।

ছবিটা দেখে হয়ত মনে করতে পারেন, আবেগের বাড়াবাড়িটা একটু বেশিই, ক্লাইম্যাক্স হয়তো অতি-নাটকীয়তা দোষে দুষ্ট। কিন্তু রোমান্টিক ম্যুভির আদলে যে ছবিটা আসলে মানবতার কথাই বলে, সেটা একটু সময় দেখলে বোধহয় ক্ষতি হবে না।


No comments:

অন্ধের স্পর্শের মতো চলে গেলেন শঙ্খ ঘোষ

 সব কবিদের গদ্য সুন্দর হয় না। কেউ কেউ আছেন যাদের দুই হাতে একসঙ্গে বাজে কবিতা আর গদ্যের যুগলবন্দি। শঙ্খ ঘোষের গদ্যই সত্যিকার অর্থে পড়েছিলাম আ...