Wednesday, October 10, 2012

আমি এবং বুড়ো লোকটা ...

 আমি এবং বুড়ো লোকটা ...

ক্লাস সিক্সের এক অলস দুপুর। কয়েকদিন আগেই বেরিয়েছে প্রথম সাময়িক পরীক্ষার ফল, হাতে অফুরন্ত অবসর। দিনমান কেটে যেত চরকির মতো বনবন করে এদিক সেদিক ঘুরে বেরিয়ে। নাওয়া খাওয়া ছাড়া টো টো করে বেড়ালে যেটা হয়, বেরসিক জ্বর এসে কাবু করল হঠাৎ। প্রথম কয়েকদিন তো জ্বরের প্রকোপ কমেই না। একটু যখন কমল, তখন ডাক্তার আঙ্কেল সাফ সাফ বলে দিলেন সাতদিনের কমপ্লিট বেড রেস্ট। বন্ধুরা যখন সমানে ছক্কা পিটিয়ে যাচ্ছে তখন আমি কিনা শুয়ে বসে দিন কাটাচ্ছি। কেমনটা লাগে বলুন তো? এমনই একদিন আমার জেঠু (আমি ডাকতাম জেঠূমণি) নিয়ে আসলেন পেপারব্যাকের কয়েকটি বই। একটার ওপর নীল তিমির ছবি, বড় বড় হরফে লেখা-তিন গোয়েন্দা , ভলিউম তিন-এক। এর আগে গোয়েন্দার কিছু বই পড়েছিলাম , কিন্তু সেভাবে বুঁদ হইনি তখনো। বইটা যেন আমার জগৎটাকে হঠাৎই এলোমেলো করে দিল। নাওয়া খাওয়া ভুলে পড়ে ফেললাম সবকটি বই। কখনো কিশোর, মুসা, রবিনদের নিয়ে চলে যাচ্ছি শ্বাপদসংকুল ভীষণ অরণ্যে, কখনো এনথনি শোঁপাকে তাড়া করতে করতে খুলছে হয়েছে সাতটি কাকাতুয়ার দুর্বোধ্য সব রহস্যের গেরো। আবার কখনো খুলতে হয়েছে রাইমিং স্ল্যাঙের জট। কয়েকটি দিন যেন স্রেফ উড়ে গেল । কিশোর, মুসারা কখন আমার অতি কাছের বন্ধু হয়ে গেল টেরই পেলামনা।

ধান ভানতে শিবের গীত অনেকই গাওয়া হল। মোদ্দা কথা হলো জেঠামণিই আমার হাতে তুলে দিয়েছিলেন মায়াবী এক রহস্যের চাবি, যে দরজা দিয়ে একবার ঢুকলে বের হয় কার সাধ্যি? এর পর থেকে বাসায় এলেই হাতে করে নিয়ে আসতেন নিত্যনতুন সব সেবার বই। ট্রেজার আইল্যান্ড, ক্লিপার অব দ্য ক্লাউডস, টোয়েনটি থাউজ্যান্ড লিগ আন্ডার দ্য সির মতো বইগুলো তাঁর হাত ধরেই পড়া। নিজে ছিলেন অতি নির্বিরোধী সাদাসিধে একজন মানুষ। সরকারি চাকরি করতেন, আটটা-পাঁচটা অফিসের পরের সময়টুকু ডুবে থাকতেন বইয়ে। ক্লাসিক সাহিত্য টাহিত্য পড়তে কখনো দেখিনি, তাঁর সবসময়ের সঙ্গী ছিল কাজীদার মাসুদ রানা। তখনো কাঁচা বয়স, বন্ধুরা বলত মাসুদ রানা নাকি "বড়দের বই।" বড়দের বই,সেটা আবার কী জিনিস? ভেতরে ভেতরে পড়ার জন্য দুর্মর আগ্রহ হত, কিন্তু জেঠামণি তখনো ভাইপোর পাতে বইগুলো তুলে দেওয়ার সময় এসেছে বলে মনে করেননি। তবে মওকা পেলে উনার বুক শেলফ থেকে চুরি করে পড়ে ফেলতাম বই। যদ্দুর মনে পড়ে, প্রথম পড়া রানা ছিল অপহরণ। সেই টিউলিপ কনওয়ে, আমেরিকার প্রেসিডেন্টের মেয়ে অপহরণের সেই দুর্ধর্ষ কাহিনি। খুব একটা বড়দের কিছু মনে হয়নি অবশ্য। আরেকটু বড় হয়েই আস্তে আস্তে সাবড়ে দিতে লাগলাম রানার অন্য বইগুলো ও । তখন বোধহয় পড়ি নাইনে কি টেনে। অগ্নিপুরুষ পড়ার কথা তো এখনো স্পষ্ট মনে পড়ে। ঈদের সময় আমরা সবাই তখন গ্রামের বাড়িতে। এমন সময় হাতের কাছে পেলাম অগ্নিপুরুষ, একদম আক্ষরিক অর্থে এক বসাতেই পড়েছিলাম পুরোটা। শেষ করার পর চাপা কান্না -বেদনার এক অদ্ভুত অনুভূতি যেন দলা পাকিয়ে উঠতে থাকার আমার মধ্যে। স্রেফ একটা থ্রিলারই, কিন্তু এমন দুর্দান্ত বই তখনো খুব একটা পড়িনি। বারবার শুধু মনে হত, কি হতো লুবনা মেয়েটা বেঁচে থাকলে? 


আরেকটা জিনিসের হাতেখড়ি ও তাঁর কাছেই, দাবা খেলা। ঠিক হাতেখড়ি বললে ভুল হবে, একদম গোড়ার দীক্ষাটা পেয়েছিলাম মার কাছে। কিন্তু ভদ্রমহিলা সংসার সামলে ছেলেকে সবসময় সময় দিতে পারতেন না। তাই জেঠুমণি বাসায় এলেই আমি বসে যেতাম দাবার বোর্ডে। জেতার অদ্ভুত একটা জেদ তখন এই অপোগন্ড বালকের মাঝে ভীষণভাবে কাজ করত, যতক্ষণ না পারছি ততক্ষণ খেলেই যেতে চাইতাম। একবার কীভাবে যেন দুম করে উনাকে হারিয়ে দিলাম। তখন আমাকে আর পায় কে? জিতেছি জিতেছি বলে সারা বাড়ি মাথায় তোলাটুকুই বাকি ছিল কেবল। উনার ঠোঁটে কি একটা মুচকি হাসি খেলা করেছিল? হতে ও পারে, ভাইপোকে অনেক কিছুর বিনিময়ে কিনতে না পাওয়া আনন্দটুকু দেওয়ার জন্য উনি নিশ্চয়ই এতটুকু ছলনা করতে দুবার ভাবেননি! দাবা খেলায় খুব ভালো ছিলাম বলবনা, তবে ভিতটা মজবুত করে দিয়েছিলেন ঐ কাঁচাপাকা চুলের বুরুশ করা ভদ্রলোকই। 

বয়সে আমার বাবার চেয়েও ছিলেন বড়, কিন্তু আমার সাথে আচরণ করতেন সমবয়সীর মতো। খেলাপাগল ছিলেন ভীষণ, ক্রিকেট খেলার খুঁটিনাটি তাঁর কাছেই শেখা। আর একটা অদ্ভুত শখ ছিল তাঁর, রেডিও শোনা। প্রায়ই শুনতাম রেডিওটা কানের কাছে গুঁজে বসে আছেন। পুরনো দিনের মানুষ ছিলেন বলেই হয়তো সবার সাথে তাল মিলিয়ে পুরোপুরি আধুনিক হতে পারেননি। শ্বাসকষ্টের সমস্যায় ভীষণ ভুগতেন, বেশ কিছুদিন পর পর হাসপাতালে যেতে হতো। শেষ নয়সে তো হাসপাতালের বেডই হয়ে গিয়েছিল স্থায়ী ঠিকানার মতো। যৌবনে চেইন স্মোকার ছিলেন বলেই নাকি জীবন সায়াহ্নে এসে ফুসফুসটা একেবারেই অকেজো হয়ে গিয়েছিল। অনেকদিন ধুঁকে ধুঁকে বেঁচে ছিলেন, সেটাকে অবশ্য বেঁচে থাকা বলে কিনা জানিনা। একসময় নিজেই হয়তো চেয়েছিলেন মুক্তি পেতে, শেষদিকে এসে কোন অব্যক্ত যন্ত্রণায় সেটার কি আভাস দিয়েছিলেন? অন্তত আমার সেরকমই মনে হয়েছিল।

সেবার সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়া সেই চুপচাপ মানুষটি কদিন আগেই বড় চুপিসারে চলে গেলেন। এক     অঝোর বর্ষণস্নাত দিনে চলে গেলেন নীরবে। আমি এই ইটকাঠের খাঁচায় পড়ে ছিলাম বড় অসহায় হয়ে, সামনে অগ্নিপুরুষের খোলা পাতা, তার মাঝে মুচকি হাসছেন বুড়ো লোকটা...







অন্ধের স্পর্শের মতো চলে গেলেন শঙ্খ ঘোষ

 সব কবিদের গদ্য সুন্দর হয় না। কেউ কেউ আছেন যাদের দুই হাতে একসঙ্গে বাজে কবিতা আর গদ্যের যুগলবন্দি। শঙ্খ ঘোষের গদ্যই সত্যিকার অর্থে পড়েছিলাম আ...