Wednesday, December 14, 2011

চলে যাওয়া মানেই প্রস্থান নয়-১ (র‍্যাগ কর্নার)

বুয়েট জীবনের শুরু থেকে তেরছাভাবে ওইদিকে তাকিয়ে থাকতাম, মেশানো ছিল খানিকটা সম্ভ্রম আর শ্রদ্ধা। ক্যাফেটেরিয়ার এক কোনায় ঐ সংকীর্ণ জায়গাটা আসলে কি, এমন সওয়ালও মনে হামেশা উদয় হত। একদিন জানলাম ওটার নাম র‍্যাগ কর্নার। ওখানে র‍্যাগ দেওয়া হয়না জানতাম, পরে জেনেছিলাম ওটা ছিল শেষ বর্ষের ছাত্রদের জন্যই এক্সক্লুসিভলি বরাদ্দকৃত। এরপর অনেকগুলো টার্ম পেরিয়ে গেল, ক্যাফেটেরিয়ার দিকে হেঁটে যাওয়ার সময় আড়চোখে চেয়ে প্রায়ই ভাবতাম, আর বেশি দেরি নেই, এবার র‍্যাগ কর্নারে একটা আস্তানা গেঁড়ে ফেলবই।

দেখতে না দেখতেই(বলা ভাল কিছু বুঝে ওঠার আগে) ফাইনাল ইয়ারের ছাত্র বনে গেলাম। এইবার আর আমাদের ঠেকায় কে? এতদিন সিনিয়রদের গানের তালে তালে হল্লামাস্তি করতে দেখেছি, এবার আমাদের মওকা। শুরুর দিন থেকেই মনে বেশ একটা উড়ো উড়ো ভাব, আমরা র‍্যাগ ব্যাচ, আমাদের জন্য র‍্যাগ কর্নার আদপেই ছিল একটা স্পেশাল প্রিভেলেজ। এবার শুরু হল র‍্যাগ কর্নারকে নিজেদের মনের মাধুরী মিশিয়ে সাজানোর পালা। অনেক হ্যাপার পর, ক্যানভাসার রংমিস্ত্রিদের মুন্সীয়ানায় একসময় র‍্যাগ কর্নার বেশ একটা খোলতাই রূপ নিল। ক্যানভাস ০৬ এর বর্ণালীতে তখন সেটা উদ্ভাসিত। আমরাও কিঞ্চিত কালবিলম্ব না করে ঝটপট ছবি তুলে ফেলতে লাগলাম, বলা বাহুল্য অনেকটা আয়োজন করেই।

গোড়ার দিকে অবশ্য র‍্যাগ কর্নারে ছেলেপেলে খুব একটা ঢুঁ মারতনা, আমরা, ক্যাম্পাসের চেনা কিছু মুখগুলোই কুমীরের বাচ্চার মত করে নিজেদের হতশ্রী বদন নিয়ে বসে থাকতাম চাতক পাখির মত। কিন্তু ৪-১ এর বেশ কিছুদিন পরে যখন সাউন্ডবক্স চলে আসল তখন আমাদের যাকে বলে আকাশের চাঁদ হাতে পাওয়ার মত দশা। নিজেদের ইচ্ছেমত গান বাজিয়ে পুরো পলাশীস্থিত এলাকা মাত করে দিয়ে আমরা ক্ষরিক অর্থেই পৈশাচিক আনন্দ পেতাম। আমরা নাম্বার অফ দ্য বিস্টের সাথে সজোরে মাথা ঝাঁকাতাম, সুইট চাইল্ড ও মাইনের সাথে আনমনে গুনগুন করে উঠতাম, পাগলা হাওয়ার তোড়ে হেঁড়ে গলা ছেড়ে গান ধরতাম। এরপর র‍্যাগ কর্নার ধীরে ধীরে জমজমাট হওয়া শুরু করল। চায়ের কাপে, সিগ্রেটের ধোঁয়ার কুন্ডলীতে আমাদের দিনগুলো কেটে যেত বেশ। আগে ব্যস্ততা যাদের অবসর দিতনা তারাও এখন সুযোগ পেলেই একপলক দেখা করে যেতে ভুলতনা। ক্লাসের অবসরে আমরা দল বেঁধে জড়ো হতাম, ব্রেকের পরেও আড্ডার তোড়ে কখন আরেকটি ক্লাসের সময় এসে যেত টের পেতামনা। দেখা যেত, ম্যানইউ-আর্সেনালের তোপে, এল ক্লাসিকোর দাপটে, কখনোবা আশরাফুলের চোদ্দগুষ্ঠি উদ্ধার করে ক্লাসগুলোও ফাঁকি মেরে পালিয়ে যেত।

৪-২ থেকে অবশ্য র‍্যাগ কর্নারের আসল মহিমা আমরা মর্মে মর্মে টের পেতে শুরু করি। একদিন সাহস করে একটা দুষ্টু গানের সাথে উদ্দাম নৃত্যের পর একটু একটু করে আমাদের সংযমের বাঁধ ভেঙ্গে যায়। এরপর আমরা যেমন রক অ্যান্ড রোলের তালে তালে গলা মেলাতাম, ঠিক তেমনি চটুল গানের সাথে রুপবানেরাও কোমর দুলিয়ে নাচতাম। র‍্যাগ কর্নার এবার আসলেই জমজমাট, যারা আগে কস্মিনকালেও ক্যাফের ছায়া মাড়ায়নি, তারাও একে একে আমাদের মত অপোগণ্ডদের দলে বিলকুল মিশে গেল। তড়িৎকৌশল, কম্পুকৌশলের দোস্তরাও এবার ফাঁক পেলেই সেই সাত সমউদ্দুর তেরো নদী পেরিয়ে পলাশীর প্রান্তর থেকে জড়ো হত এখানে। এমনিভাবে অনেক নতুন মুখের সাথে দেখা হল, অনেকের সাথে অন্তরঙ্গতাও হয়ে গেল ভীষণভাবে। সাথে সাথে সামনের একচিলতে খালি জায়গায় ব্যাট বল নিয়ে কসরত করা হত ফুরসত পেলেই। সাউন্ড সিস্টেমের প্রকম্পিত গানের সাথে খেলা, সাথে সাথে সব টিপ্পনী ফোঁড়ন কাটা তো চলতই।

র‍্যাগ কর্নারের পিক হাওয়ার যদি বলি, তাহলে সেটা বেলা একটাতেই। থিসিস, ক্লাসটেস্ট দিয়ে হেঁদিয়ে পড়া জনগণ তখন জুড়ে দিত নাচের মচ্ছব, আর কি বিচিত্র সেইসব নাচের মুদ্রা। শোভন-অশোভন সবরকম গানের সাথেই চলত সব নিত্য উদ্ভাবিত নাচের মুদ্রার জলসা।বেলা একটা দুইটা প[আর হয়ে যেত, কিন্তু নাচের আসর কমতনা। এমনকি ক্যাফের সামনেও নৃত্যপটিয়সী আমাদের প্রায়ই শরীর ঝাঁকাতে দেখা যেত। ওদিকে প্রতিদিনই চলত ফটোসেশন, একেকজনের ছবি তোলার আবদার মেটাতে মেটাতে ক্যামেরবাজরা প্রায়ই জেরবার হয়ে পড়ত। তবু যেন কারো আঁশ মেটেনা, ফেসবুক প্রোফাইলে দুদিন পর পর খোমা পরিবর্তনই এর উৎকৃষ্টতম সাক্ষী।

আর মাত্র কয়েকটা দিন বাকি, এই কদিনে র‍্যাগ কর্নারে ফূর্তির বহর আসলেই ছিল লাগামছাড়া। মিউসিক্যাল চেয়ারে রোল নাম্বার পাওয়া নিয়ে সবার অত্যুৎসাহ সেই ফূর্তিতে যোগ করল নতুন মাত্রা। কারো কারো দৈনিক রুটিন এখন আদতেই র‍্যাগ কর্নার টু হল, হল টু র‍্যাগ কর্নার, ক্লাসের কোন ছায়া না মাড়িয়েই। এই সময়টাতে এসে মনে হচ্ছে, আর কিছুদিন পরেই আমরা এই নিজভূমে হয়ে পড়ব আগন্তুক, আপন জায়গাটা হয়ে পড়বে অচেনা। দুত্তোর, এইসব মন খারাপ করা ছেদো কথা আর না লিখি, আরও তো কটা দিন আছেই। দেখা হবে র‍্যাগ কর্নারে সপ্তা পেরিয়েই, আমি আসছি, আপনি আসছেন তো?

No comments:

অন্ধের স্পর্শের মতো চলে গেলেন শঙ্খ ঘোষ

 সব কবিদের গদ্য সুন্দর হয় না। কেউ কেউ আছেন যাদের দুই হাতে একসঙ্গে বাজে কবিতা আর গদ্যের যুগলবন্দি। শঙ্খ ঘোষের গদ্যই সত্যিকার অর্থে পড়েছিলাম আ...