Tuesday, August 23, 2011

রেখাচিত্রঃ একটি অনন্য ভূয়োদর্শন


রেখাচিত্র লেখকের ভাষায় আত্মজীবনী নয়- বরং স্মৃতিকথা মাত্র। বলাই বাহুল্য, বিশিষ্ট সাহিত্যিক আবুল ফজলের এ রচনা তার অন্যতম সাহিত্যকীর্তি। তাই স্মৃতিকথার গণ্ডি পেরিয়ে এ গ্রন্থখানি তে আত্মজীবনীর সব রকম রসদই এন্তার মজুদ আছে, তার সাথে অভিনিবেশকারী পাঠক একমত হবেন বলেই ধারণা। বইটিকে গত শতকের গোড়ার দিক থেকে শুরু করে ষাটের দশকের আগ পর্যন্ত একটা অত্যন্ত ঘটনাবহুল ও গুরুত্বপূর্ণ সময়ের প্রামাণ্য দলিল বললে মোটেই অত্যুক্তি হবেনা। লেখক জন্মেছিলেন ১৯০৩ সালে, তখনো পূর্ববঙ্গের মুসলিম সমাজ মানসিক গড়নটি অতটা খোলতাই হয়নি। ইংরেজ শাসনের অধীনে তখনো মুসলমানেরা সামাজিকভাবে বেশ খানিকটা পিছিয়েই ছিল। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে যাদের প্রচেষ্টা প্রাতঃস্মরণীয়, তাদের মাঝে আবুল ফজলের নাম নির্দ্বিধায় স্মরণ করা যায়। তবে এই প্রক্রিয়া যে মোটেই সহজ ছিলনা, বরং ছিল নানা অযাচিত প্রতিবন্ধকতার ছোবল, তা আমরা রেখাচিত্র পড়েই জানতে পারি। একটি আগাগোড়া ধর্মভীড়ু মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেও আবুল ফজল কীভাবে সাহিত্যের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়েন তাও আমরা এই গ্রন্থের মাধ্যমেই জানতে পারি।

পুরনো ঢাকার হকিকত সম্বন্ধে আমরা অনেকেই জানি, ঢাকার নবাবদের শানশওকতের কথা আজ কিংবদন্তীই বটে। অথচ চট্টগ্রামের আলোছায়ায় বেড়ে ওঠা সত্ত্বেও সেকালের চাঁটগার কোন হদিস আমি এই বইটি পড়ার আগে জানতামনা। লেখকের জন্ম সাতকানিয়ার প্রত্যন্ত জনপদে হলেও পিতার কর্মসূত্রে শিক্ষাদীক্ষার পাট তিনি শহরেই নেন।তবে পিতার কর্মসূত্রের ব্যাপারটা আরেকটু খোলাসা এখানে করতেই হবে। লেখকের পিতা ছিলেন চট্টগ্রামের ইতিহাসপ্রসিদ্ধ জুমা মসজিদের ইমাম, দীর্ঘ বত্রিশ বছর তিনি এ গুরুদায়িত্ব পালন করেন। পিতার শ্যেন দৃষ্টিতে থাকার পরও কীভাবে লেখকের ভেতরে প্রগতিশীলতার বীজ বপন হয় সেটাও খানিকটা অভাবনীয়ই বটে।আগেই বলেছি, লেখকের শিক্ষার হাতেখড়ি হয় চাটগাঁতেই। এ সুবাদে সেই সময়ের চট্টলার একটা অবয়ব তার লেখাতে ধরা পড়ে।চট্টলার ঐতিহ্যবাহী কাজী বাড়িতে বালক বয়সেই তিনি জায়গীর নেন। এবং পাকেচক্রে এই কাজীবাড়ির সাথেই তিনি এক অবিচ্ছেদ্য বন্ধনে জড়িয়ে যান। পরবর্তীতে ওই এলাকাতেই পাকাপোক্তভাবে আস্তানা গাঁড়ার মাধ্যমে এ সম্পর্ক আরও জোরদার হয়।

এইখানে কয়েকটা লক্ষণীয় বিষয়ের কথা না বললেই না। কাজীবাড়িতে জায়গীরের ঘটনা লেখকের ভাষায় পিতার কঠোর শাসন থেকে মুক্তির একটি মোক্ষম উপলক্ষ। তখনও মাদ্রাসা শিক্ষাকেই তিনি আঁকড়ে ধরে রেখেছিলেন, তবে এই ধর্মনির্ভর শিক্ষার প্রতি বীতশ্রদ্ধা না হোক বৈরাগ্যের আঁচ কিন্তু তার লেখাতে ধরা পড়ে। জুমা মসজিদের প্রধান ইমামের পুত্র, তাই পিতার ভাবমূর্তির কারণে তাকেও মসজিদে আযান দেওয়া থেকে শুরু করে বিভিন্ন আনুষ্ঠানিক কাজে প্রায়ই জড়িয়ে যেতে হত। ব্যাপারটা তার জন্য খুব স্বস্তিদায়ক ছিলনা, একথা না বললেও চলে। তার নিজের ভাষায়,ইমামের ছেলে ইমামতি করবে এত নেহাত যুক্তিসঙ্গত। আমার সম্বন্ধেও এ মন্তব্য মাঝে মাঝে না শুনেছি তা নয়। তবে দুনিয়ায় যুক্তিসঙ্গত ঘটনা কটাই বা ঘটে? বিশেষ করে উত্তরাধিকারের ব্যাপারে? বংশগতি ও মানব চরিত্র এত দুর্জ্ঞেয় ও রহস্যময় যে যুক্তি তাতে কদাচিৎ হালে পানি পায়। মূলত পিতার পদাঙ্ক যে তিনি অনুসরণ করবেননা, একথা ছেলেবেলাতেই আবুল ফজল ঠাহর করতে পেরেছিলেন।একথা অস্বীকার করার জো নেই, চাটগাঁতে থাকার ফলেই লেখকের মাঝে এই ধর্মীয় ঘেরাটোপ থেকে মুক্তির স্পৃহা ধীরে ধীরে জোরদার হয়ে উঠতে থাকে। তবে পিতার প্রভাব থেকে সটকে পড়ার ফিকির করলেও পিতার ভাবমূর্তির দুরন্ত আকর্ষণকে তিনি বোধকরি উপেক্ষা করতে পারেননি। সততা ও কর্তব্যনিষ্ঠাকে ব্রত হিসেবে নেওয়া পিতার পরিচয়ে তাই তিনি আদপে কুন্ঠিত হননি, বরং প্রচ্ছন্নভাবে শ্লাঘাসুলভ মনোভাবের কথাও জানান দিয়েছেন।

তখন মুসলিম নবজাগরণের জোয়ার বইছে, চাটগাঁতে বসেও সেই দিগন্তপ্লাবী অনলশিখার হল্কা তার গায়ে লাগল। নজরুলের সাহিত্যকর্ম লেখকের মনোজগতে এক বিপুল নাড়া দিল, তিনি যেন এক জীয়নকাঠির পরশ পেলেন। তার নিজের মুখে, এসবকে যদি মনের দিক থেকে, আবেগ অনুভূতির দিক থেকে কিছুটা প্রস্তুতি বলা যায় তাহলে ঢাকায় ছাত্রজীবন শুরু হওয়ার আগে সাহিত্যের পথে আমার এ প্রস্তুতিটুকুন মাত্র ঘটেছিল।এর মাঝেই নানান ঘটন-অঘটনের মাঝে লেখক ম্যাট্রিক পাশ করে ফেলেন।এবার হল যাকে বলে নির্ভেজাল ত্রিশঙ্কু দশা, লেখকের বরাবর বাসনা ছিল ঢাকায় গিয়ে আই.এ পড়ার। কিন্তু পিতা তার আকাঙ্ক্ষায় আক্ষরিক অর্থেই জল ঢেলে দিলেন। মাদ্রাসা পড়ে উলা পাশ করতে হবে, তিনি সাফ সাফ বলে দিলেন। এবার অবশ্য শুভাকাংখীদের হস্তক্ষেপে লেখক আই.এ পড়ার অনুমতি পেয়ে যান। মূলত এই ঢাকাযাত্রার মাধ্যমেই আবুল ফজলের ভবিষ্যত পথচলার মোড়টি বিলকুল ঘুরে যায়। সাতকানিয়ার প্রত্যন্ত জনপদের চৌহদ্দি পেরিয়ে পয়লা চট্টগ্রাম শহর, এবং পরে ঢাকায় পাড়ি জমানো তার নিয়তি মোক্ষমভাবে নির্ধারণ করে দেয়।

তবে বইয়ের যে অধ্যায়ের নাম আলাদা করে বলতেই হবে, সেটা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ে লেখকের অভিজ্ঞতার কথা। তখনো প্রাচ্যের অক্সফোর্ড কেবল উঠন্তি মূলো, ছাত্রসংখ্যাও খুব একটা বেশি নয়। এর মাঝেই সেই সুদূর চাটগাঁ থেকে লেখক ঢাকা শহরে পাড়ি জমান। এখানে তার বর্ণনায় উঠে আসে সেকালের ডাকসাইটে সব শিক্ষকদের কথা। ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, চারুচন্দ্র বন্দোপাধ্যায় সহ নামজাদা সব মানুষদের সংস্পর্শে আসতে পেরেছিলেন সেই সময়। এর মাঝে ঢাকায় কবিগুরুর আবির্ভাব,মুসলিম হলে তাঁকে সংবর্ধনা প্রদান সহ বেশ কয়েকটি ঐতিহাসিক ঘটনার সাথে মোলাকাত ঘটে যায় লেখকের। ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয় ঢাকা মুসলিল্ম সাহিত্য পরিষদের, যার মাধ্যোমে আরো অনেক গুণীজনের কথা উঠে আসে। এদিকে সমানতালে সাহিত্য নিয়ে লেখকের অক্লান্ত ভাবনার কথাও আমরা জানতে পারি। বন্ধুপ্রতিম কবি আবদুল কাদিরসহ আরো কজন উৎসাহী তরুণের চেষ্টায় এবং কয়েকজন প্রগতিশীল সাহিত্যমনস্ক ব্যক্তির পৃষ্ঠপোষকতায় তখনো হামাগুড়ি দিতে থাকা মুসলিম সাহিত্যের একটা কাঠামো ধীরে ধীরে পরিস্ফুট হতে থাকে। বিভিন্ন পত্রিকা প্রকাশিত হতে থাকে, যার মাঝে সওগাতের নাম করাই যায়। পরবর্তীতে লেখকের সম্পাদনায় শিখা পত্রিকা প্রকাশিত হয় ।

এর মাঝে লেখক তার সহজিয়া ঢঙ্গে নিজের বিচিত্র কাহিনির কথা বলে যান, আর আমরা বুঁদ হয়ে থাকি সেইসব আশ্চর্য অভিজ্ঞতার মায়াজালে। কলকাতায় গিয়ে ওকালতি পড়ার ব্যর্থ চেষ্টা এবং পরে শিক্ষকতাকে ধ্যানজ্ঞ্যান করেছিলেন আবুল ফজল। বইটি পড়ার সবচেয়ে মজার দিক হল, পড়তে গিয়ে কোথাও বেগ পেতে হয়না, স্মৃতিকথার বিচারে তার ভাষা যেমন স্বচ্ছন্দ ও সাবলীল তেমনি সাহিত্যগুণসম্পন্নও বটে। লেখায় তিনি সবখানেই সময়ের ক্রম অনুসরণ করেননি, মাঝে মাঝে তিনি ক্ষণিকের জন্য ডুব দিয়েছেন সুদূর ভবিষ্যতে, বয়ান করেছেন অন্য কোন গল্প। তাই বলে এতে বইয়ের রস আস্বাদনে মোটেও বেগ পেতে হয়না, টাল খেতে হয়না একরত্তি। যে ভূয়োদর্শনের নজির তিনি রেখেছেন, সেটা আজকের যুগের জন্য একটি দুর্দান্ত স্মারকগ্রন্থও বটে। অনেক অভিনব ঘটনার বর্ণনাই এই বইতে আছে, নাম করলে সেসবের সংখ্যা ফুরোবেনা। সব মিলিয়ে লেখকের লেখার দ্যুতিতে, প্রজ্ঞার মাহাত্ম্যে বইটি হয়ে ওঠেছে একটি সময়ের, একটি যুগের প্রতিনিধিত্বকারী, হয়ে ওঠেছে ইতিহাসের এক অসামান্য দলিল,যেন একদম পলকাটা হীরে।

No comments:

অন্ধের স্পর্শের মতো চলে গেলেন শঙ্খ ঘোষ

 সব কবিদের গদ্য সুন্দর হয় না। কেউ কেউ আছেন যাদের দুই হাতে একসঙ্গে বাজে কবিতা আর গদ্যের যুগলবন্দি। শঙ্খ ঘোষের গদ্যই সত্যিকার অর্থে পড়েছিলাম আ...