Friday, December 31, 2010

মেঘ, নদী আর পাহাড়ের দেশে-৩

থানচি যখন ছেড়ে গেলাম আকাশটা সোনারঙা রোদে ঝকঝক করছে, আগের রাত্তিরের বৃষ্টির কোন ছিঁটেফোঁটাও তখন আর অবশিষ্ট নেই, দিব্যি ঝকঝকে আকাশ।মনটা আমাদের তখন বেজায় ফুরফুরে। তবে মুশকিলটা এই যে, নৌকায় উঠে আমাদের একজায়গায় গ্যাঁট হয়েই বসে থাকতে হল, নো নড়ন চড়ন। এমনিতেই এগারজনের ব্যাকপ্যাক তো ছিলই, তার ওপর যোগ হল চাল,কলা্‌, চিড়ের ভারি বোঝার হ্যাপা। আগেই জানতাম, এই যাত্রাটা হতে যাচ্ছে বেশ লম্বা, নদীতে পানি আচমকা বেড়ে যাওয়ায় রেমাক্রিবাজারে ঠিক কতক্ষণে পৌঁছুতে পারব সেটা তখনও নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছিলনা। মাঝির কথাবার্তা শুনে ঠাহর করতে পারলাম, আজকের দিনটা মোটামুটি কলা-চিড়ের ওপর দিয়েই পার করে দিতে হবে। দুপুর নাগাদ রেমাক্রিবাজারে ঠাঁই গাঁড়তে পারব এমন ভরসাও খুব একটা নেই। ঠিক ঐ মুহুর্তে এসব অযাচিত ভাবনা বয়ে বেড়ানোর কোন খায়েশ আমাদের ছিলনা। তবে একটা ব্যাপার খেয়াল না করে পারলামনা, আগেরদিনের চেয়ে পানির উচ্চতা বেশ বেড়েছে বলে মনে হল। সেই সাথে স্রোতের ধাক্কাটাও দেখলাম বেশ জোরদার। এক রাতের বর্ষণেই এই অবস্থা, ঘোর বর্ষাকালে না জানি কি দশা হয়?

পাহাড়ে গোত্তা খাওয়া মেঘ

DSC04525

অপরূপা সাঙ্গু

DSC04555

সাঙ্গু পাহাড়ি নদী, থানচি থেকে নাফাখুমের দিকে যেতে পুরোটাই যেতে হবে স্রোতের বিপরীতে, তারমানে আমাদের সময়টা লাগবে অনেক বেশি। পাহাড়ী নদী বলে এর আচরণ ঠিকঠাক অনুমান করাটাও দুরুহ কর্ম, তবে এটা নিশ্চিত এর মাঝে বেশ ক জায়গায় কিছু জেন্টল স্লোপ পার হতে হবে। সেসব জায়গায় নৌকা কিভাবে এই প্রবল স্রোত উজিয়ে চলবে, সেটা ভাবতেই আমাদের শিরদাড়া দিয়ে উদ্বেগের চোরাস্রোত বয়ে গেল। তবে বলতেই হবে,নদীর দুপারের দৃশ্য দেখলে চোখ ফেরানো যায়না। তখনও আমরা থানচি পেরিয়ে এসেছি খুব বেশি দেরি হয়নি, সাঙ্গু এখানে অনেকটাই স্থিরমতি, আচমকা বেগড়বাই করার কোন লক্ষণও আপাতত প্রকাশ পাচ্ছেনা। দুদিকের লোকালয়ের আভাস তখনো পুরোপুরি মিলিয়ে যায়নি, মাঝে মাঝে চকিতের জন্য পাহাড়ের কোলে কাঠের খুদে বাড়িও চোখ এড়াবেনা। এই করতে করতে ঘন্টা দেড়েক পার হয়ে গেল, এবার আস্তে আস্তে নদী আপনবেগে পাগলপারা হওয়ার লক্ষণ দেখাচ্ছে, জল এখন অনেকটাই ঘোলা, নৌকার গতিও কমে গেছে অনেকখানি। সামনে তাকিয়ে দেখলাম, দুপাশে বেশ কিছু পাথর, তার মধ্য দিয়ে সটান যেন ওপরের দিকে উঠে গেছে। বুঝলাম, সামনেই আমাদের প্রথম নতি পার হতে হবে।

তবে হাত নৌকায় এলে যে ব্যাপারটা চরম আত্মঘাতী হত, সেটা আমরা এর আগেই হাড়ে হাড়ে টের পেতে শুরু করেছি। আমাদের সাথেই ঘাট থেকে আরেকদল অভিযাত্রী হাত নৌকা নিয়ে যাত্রা শুরু করে। এমনিতেই মন্থর গতি, তায় স্রোতের খপ্পরে হাঁসফাঁস করতে করতে অচিরেই তাদের এক পা এগোয় দুই পা পিছোয় দশা। আমরা যখন তাদের বেশ দূরে ফেলে এসেছি, খেয়াল করলাম তাদের নৌকা উল্টোদিকে ঘুরছে। ঐ নৌকার মাঝির দেখলাম বেজায় সাহস, কিন্তু এটা বুঝতে অন্তত দেরি হয়নি হাত নৌকায় বেশিদূর গিয়ে সেঁধে স্রোতে ভেসে যাওয়ার কোন মানে হয়না। যাই হোক, যা বলছিলাম, নদী্র এসব স্টেপ আপের সময় ইঞ্জিন নৌকাই আখেরে বেকায়দায় পড়ে যায়। কারণ এমনিতেই নৌকার ওজন বেশি, তারওপর কোন পাথরের সাথে গোত্তা খেয়ে তলা ফেঁসে যাওয়ার আশঙ্কাও অনেক। হাত নৌকার পলকা হওয়াতে এসব জায়গায় কিছুটা বাড়তি সুবিধে পায়। প্রথমবারের স্টেপ আপের সময় অবশ্য খুব একটা কষ্ট হলনা, সশব্দে ধুঁকতে থাকা ইঞ্জিন নৌকার ওপর সওয়ার হয়েই ওটা পার করে দিলাম আমরা।

কিন্তু পরের বার থেকেই লাগল যত গোল। এর মধ্যে আমরা তখনও তিন্দুতে এসে পৌঁছাইনি, ওদিকে বেলা এরই মধ্যে অনেকটা গড়িয়ে গেছে। পরের স্টেপ ডাউনে ইঞ্জিন পুরোদমে চালিয়েও দেখলাম নৌকা একবিন্দু নড়ছেনা, ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। দুপাশে তখন ভয়ংকরভাবে ফুঁসে ওঠা স্রোত আমাদের পাশ দিয়ে নিচে নেমে যাচ্ছে। বোঝা গেল, ইঞ্জিনের ওপর ভরসা করা বৃথা, এবার নৌকা থেকে না নামলেই নয়। খুব সাবধানে আমরা খানিকটা তীর ঘেঁষে নেমে পড়লাম। নদী অবশ্য খুব একটা গভীর নয় তখনো। তলায় কিছু আলগা পাথর ছিল, তাই প্রতিটি পদক্ষেপ নিতে হচ্ছিল অতি সন্তর্পণে। তবে যে জায়গাটায় ঠিক নৌকা আটকে আছে ওখানে স্রোত রীতিমত ঘূর্ণিপাক তৈরি করেছে। সেখানে একবার পড়লে আমাদের লাইফজ্যাকেটও যে কোন ফায়দা দেবেনা সেটা বুঝতে খুব একটা কষ্ট হলনা কারো। ততক্ষণে মাঝিরা অবশ্য দড়ি দিয়ে নৌকা বেঁধে রীতিমত টানাহেঁচড়া শুরু করে দিয়েছে। আমরাও মিছে বসে না থেকে হাত লাগাতে শুরু করলাম। এর মধ্যে খুব সতর্কতার সাথে বড় পাথরগুলোকে পাশ কাটিয়ে নৌকা একতিল করে সামনে এগোতে শুরু করল। মাঝিদেরকে দেখে বুঝলাম তাদের দস্তুরমত ঘাম ছুটে যাচ্ছে। অবশেষে প্রথম স্টেপ ডাউনটা আমরা কোন হ্যাপা ছাড়াই পার হলাম।

প্রথম স্টেপ আপ

DSC04591

দড়ি ধরে মার টান

DSC04607

DSC04613

তিন্দুতে নামার ঠিক আগে যে স্টেপ আপটা পেলাম, সেটা অবশ্য আরো গোলমেলে। এখানে পাথরগুলো খুবই বিপজ্জনক, কিছু কিছু তো রীতিমত চোখা। এ জায়গায় নদী অনেকটা চওড়া হয় গিয়েছে, তাই আগের মত "দড়ি ধরে মার টান" পদ্ধতিতে লোকবলও লাগল দ্বিগুন। আমাদের মত কিছু উঁনপাজুরে গেলবার রেহাই পেলেও এবার সবাইকে শক্ত হাতে দড়ি ধরতে হল। এর পর শুরু হল মরণপণ টান। এই করতে করতে এবারের স্টেপ আপটাও মোটামুটি নির্বিবাদে পার হওয়া গেল। আর আমাদের একজনের এক পাটি জুতো সাঙ্গুর জলে চিরতরে হারিয়ে গেল, আফসোস বলতে এটাই। এরপর তিন্দু পৌঁছাতে আমাদের খুব একটা সময় লাগেনি। তবে কাকতাল যে কতটা বিটকেলে হতে পারে, সেটা বুঝলাম তিন্দুতে এসে। আমাদের আরো কিছু ভার্সিটি ফ্রেন্ড দেখি এখানে আড্ডা গেড়ে আছে। তবে তাদের সাথে কথা বলে মনটাই দমে গেল। আগেরদিনের বৃষ্টিতে নাফাখুমের পানি নাকি বেশ বেড়ে গেছে, কোনো গাইডই নাকি নাকি তাদের নিয়ে যেতে রাজি হচ্ছেনা। বাধ্য হয়ে তারা রেমাক্রিবাজার থেকেই নাফাখুম প্রজেক্ট ইস্তফা দিয়ে চলে এসেছে। ভাবনায় পড়ে গেলেও আমরা খুব একটা পাত্তা দিলামনা, দেখাই যাক সামনে কী আছে কপালে। তিন্দু একটা বেশ জনাকীর্ণ পাড়া(অন্তত এসব এলাকার নিরিখে তো বটেই)। আমাদের মাঝি ভাইয়েরা এখানে দেখলাম বেশ প্রেমসে মধ্যাহ্নভোজন সেরে নিচ্ছে। আমাদেরও পেটে খিদেটা বেশ ভালমত চাগিয়ে উঠল, কিন্তু বেরসিক সময় বাগড়া দেওয়ায় সে যাত্রায় ডাল-ভাতের ভোজনের পাট মুলতবি রেখে কলা চিড়ের ফলার দিয়েই দুপুরের পেটপুজোটা সেরে নিতে হল।

তিন্দুতে...

DSC04620

কান্ডারি হুঁশিয়ার..

DSCF0553

তিন্দু ফেলে যখন এসেছি, তখন ঘড়ির কাটা প্রায় বারটা ছুইঁ ছুঁই। তবে আশার কথা এই, সামনের পথ আর খুব বেশি বাকি নেই। আর আশঙ্কার কথা হল, এরই মধ্যে আমাদের একাধিকবার নৌকা ঠেলতে হতে পারে, বিশেষ করে বড়পাথরের ওখানে তো বটেই। বড়পাথর জায়গাটার একটু বর্ণনা এই মওকায় দিয়ে রাখি। বড়পাথর (অনেকে হয়তো আবার রাজাপাথর বলেও চিনে থাকতে পারেন) তিন্দু থেকে বেশ খানিকটা সামনে। হঠাৎ করে দূর থেকে দেখলে মনে হবে, নদীগর্ভে পেল্লায় কিছু পাথর আকাশ ফুঁড়ে উদয় হয়েছে। এটা বোধহয় বলে না দিলেও চলে, এসব দানবাকৃতি পাথরের জন্যই জায়গাটার নাম বড়পাথর। বড়পাথরে পাথরগুলো যেমন বিশাল, স্রোতের তীব্রতাও তেমনি প্রচণ্ড। এ জায়গায় এসে আমাদের কপালে দুশ্চিন্তার বিশাল খাঁজ পড়ে গেল, নৌকা তো স্রোত পেরিয়ে কোনভাবেই যেতে পারবেনা, তবে উপায়? এর আগে যেখানেই নেমেছি, নদীর গভীরতা ছিল কম, কিন্তু এখানে গভীরতা যে আসলে ঠিক কতটুকু তা বলার কোন উপায় নেই। আর একবার পাথরগুলোর সাথে ধাক্কা খেলে আর দেখতে হবেনা বৈকি। কিন্তু উপায়ান্তর না দেখে পাথরগুলোর কিনার ঘেঁষে আমাদের নেমে পড়তে হল। এখানে মোটামুটি উদর পর্যন্ত পানি, তবে স্রোতটা তীব্র বলে আমরা মানবশিকল তৈরি করে নিয়েছিলাম। এ জায়গাটায় নামতেও হিম্মত লাগে, নৌকা ঠেলা তো দিল্লি দূর অস্ত। কিন্তু অন্তত দুজনকে হাত লাগাতে হবেই। আমাদের অনেকের সাহসটা একটু বেশিই ছিল, তাই নৌকা ঠেলে বড়পাথরও পার করে ফেললাম। তারপরও শেষ রক্ষা হতনা, যদিনা আমাদের অকুতোভয় মাঝি অংসাপ্রু একটা ঘূর্ণিপাকে পড়ে তলিয়ে যেতেন। ভাগ্য সেদিন সহায় না হলে আমাদের একজন মাঝিকে সাথে সাথে ধরে ফেলতে পারতনা, আর মাঝিও নিশ্চিতভাবে পাথরগুলোতে গিয়ে ধাক্কা খেত।

বড়পাথর
DSC00241

DSC00237

DSC00238

বড়পাথরের পর আর তেমন কোন ঝক্কি রইলনা। এবার পাহাড়গুলো আরো গগনচুম্বী হয়ে উঠেছে। এর মাঝে আমরা অনেকটুকু পথ পেরিয়ে এসেছি। বড়পাথরের পরও আরো বার দুয়েক নৌকা টানতে নেমে পরতে হয়েছিল, তবে অসব জায়গায় স্টেপআপগুলো অতটা খাড়া ছিলনা, তাই আমাদের খুব একটা বেগ পোহাতে হয়নি। এসব করতে করতে মোটামুটি বেলা তখন তিনটা ছুঁই ছুঁই। অনেক দূর থেকে পাহাড়ের ওপর একটা ছোট্ট বাড়ি চোখে পড়ল। তিন্দু ছেড়ে আসা অবধি আর কোন ধরনের লোকালয় আমাদের চোখে পড়েনি। বুঝতে পারলাম, রেমাক্রিবাজার এসে গিয়েছি। হিসেব করে দেখলা, সকাল আটটা থেকে বেলা তিনটা, প্রায় সাত ঘন্টার এক রোমহর্ষক সফর আমরা সাঙ্গুবক্ষে কাটিয়ে এলাম। জার্নি বাই বোট বোধহয় একেই বলে!

No comments:

অন্ধের স্পর্শের মতো চলে গেলেন শঙ্খ ঘোষ

 সব কবিদের গদ্য সুন্দর হয় না। কেউ কেউ আছেন যাদের দুই হাতে একসঙ্গে বাজে কবিতা আর গদ্যের যুগলবন্দি। শঙ্খ ঘোষের গদ্যই সত্যিকার অর্থে পড়েছিলাম আ...