Saturday, September 4, 2010

একছটাক কায়েস আহমেদ-১

তাঁর সাথে আমার পরিচয় কোন এক ঘোরতর দাবদাহের দিনে। আজিজের সামনে দিয়ে যাচ্ছিলাম, ঢুঁ মারার লোভটা বরাবরের মত সংবরণ করতে পারলামনা। দোকানে থরে থরে সাজিয়ে রাখা বইগুলোকে আলগোছে চেখে নিচ্ছিলাম। পকেটের অবস্থা তখন গড়ের মাঠপ্রায়, তাই চাখতেও হচ্ছিল রয়েসয়ে, পৃথুল বইগুলোর লোলুপ প্রলোভন এড়িয়ে ক্ষীণবপুগুলোর দিকে। হঠাৎ করেই হলুদ মলাটের একটি বইয়ের ওপর নজর আটকে গেল। বলে রাখা ভাল, খানিকটা অবাকই হলাম ফ্ল্যাপ উলটে, মোটে ২৮৬ পৃষ্ঠার বইয়েই কীনা এই লেখক তার সব কথা বলে গেছেন। আরো কদ্দুর গিয়ে দেখি রচনাসমগ্রের ভূমিকা লিখেছেন খোদ আখতারুজ্জামান ইলিয়াস। নাহ! অবশিষ্ট দ্বিধাটুকুকে ঝেড়ে ফেলে চটজলদি বইটা বগলদাবা করে নিলাম। কায়েস আহমেদের সাথে আমার অযাচিত পরিচয়টা এভাবেই।

একজন লেখকের বলার খুব বেশি কিছু থাকতে পারেনা, একথা আমি কায়মনোবাক্যে মানি। তারপরেও বলতেই হবে, কায়েস আহমেদ একটু বেশিই স্বল্পপ্রসূ লেখক। সমকালীন বাংলা সাহিত্যের তিনি মোটেই কোনো দিকপাল নন, প্রচারের শীর্ষে থাকা দৈনিকের রগরগে সাহিত্য পাতায় তাঁকে নিয়ে আদিখ্যেতাও করা হয়না মোটেই, বইমেলার চটকদার সব বইয়ের মাঝে তাঁর দুই মলাটে আবদ্ধ সাহিত্যকীর্তিকে খুঁজে পাওয়াও ভার হবে। এতকিছুর পরেও কায়েস আহমেদকে অস্বীকার করা যায়না, তাঁকে বাংলা সাহিত্যে স্বতন্ত্র একটি ঠাঁই দিতেই হয়। কেন? এ সওয়ালের হদিস পেতে হলে আমাদের একটু সামনে যেতে হবে।

একটা কথা হলফ করে বলা যায়, বাজারি সাহিত্যের পলকা রোশনাই কায়েস আহমেদকে কখনো টলাতে পারেনি। তিনি লিখেছেন কম, কিন্তু যে চেতনাকে তিনি ধারণ করেছেন , যে বিশ্বাস তাকে রসদ যুগিয়েছে, তার দ্যুতি তাঁর রচনা থেকে হামেশাই ঠিকরে পড়েছে। ইলিয়াস “ মরিবার হ’লো তার সাধ” প্রবন্ধে তাঁকে নিয়ে বলতে পেরেছেন,

প্রতিষ্ঠা ও খ্যাতি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বেশিরভাগ লেখকের কাছে লেখাটা হল অভ্যাসমাত্র-চাকরিবাকরি আর ব্যবসাবাণিজ্য আর দেশপ্রেমের ঠেলা সামলাতে এনজিও বানিয়ে মালপানি কামাবার সঙ্গে তখন এর কোনো ফারাক থাকে না। তখন লেখায় নিজের সুখ আর বেদনা জানান দেওয়াটা হয়ে দাঁড়ায় তেল মারা আর পরচর্চার শামিল। লেখক হিসেবে সেই সামাজিক দাপট কায়েসের শেষ পর্যন্ত জোটেনি। তাই, কেবল মানুষের খুঁত ধরে আর দুর্বলতা চটকে সাহিত্যসৃষ্টির নামে পরচর্চা করার কাজটি তাঁর স্বভাবের বাইরেই রয়ে গেল। আবার “এই দুনিয়ায় সকল ভালো/ আসল ভালো নকল ভালো...” এই ভেজাল সুখে গদগদ হয়ে ঘরবাড়ি, পাড়া ,গ্রাম, সমাজ ,দেশ, পৃথিবী, ইহকাল ও পরকাল সবকিছুতেই তৃপ্তির উদ্গার শুনিয়ে মধ্যবিত্ত পাঠকদের তেল মারার কাজেও তিনি নিয়োজিত হননি।


ষাটের দশকের ছোটগল্পের ভরা জোয়ারের প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন কায়েস আহমেদ। তবে বাঁধাগতের জোয়ারে তিনি গা ভাসিয়ে দেননি, নিজের বিশিষ্টতাকে তিনি সযত্নে লালন করেছেন, লকলকিয়ে একে বেমক্কা বেড়ে উঠতে দেননি। তাঁর প্রথম ছোটগল্পগ্রন্থ “অন্ধ তীরন্দাজ” এই সাধনারই ইঙ্গিতবাহী। তবে লেখক হিসেবে তিনি এই গ্রন্থে যথেষ্ট পরিমিতিবোধের পরিচয় দিয়েছেন, এমন বলাটা ভুল হবে। তিনি প্রায়শই নিরীক্ষা করেছেন, কারণে বা অকারণে, কিন্তু মাঝে মাঝেই তিনি খেই হারিয়েছেন, গল্পগুলো যেন দিকভ্রষ্ট হয়ে পড়েছে, কদাচিত কোন কানা গলিতে গিয়ে গোত্তা খেয়েছে। কাহিনির প্রতি, ডিটেলসের প্রতি তার মোহগ্রস্ততার কারণে চরিত্রগুলোর সহজাত পরিবৃদ্ধি তাই অনেক ক্ষেত্রেই ঠোকর খেয়েছে। তার দুর্দান্ত কিছু প্লটও ঠিক একই কারণে হয়ে উঠেছে বক্তব্যপ্রধান। তবে ডিটেলসে তাঁর অত্যাগ্রহ যে অমূলক নয়, সেটা কিন্তু মাঝেমাঝেই বিমূর্ত হয়ে উঠেছে, ঝিলিক দিয়ে উঠেছে-



গাছপালার ফাঁকে ফাঁকে, জন্ডিস রোগীর মতো ফ্যাকাশে, ক্রমাগত নিঃশোষিত হয়ে আসতে থাকা বনতুলসী, চিচ্চিড়ে, আশ শ্যাওড়া বন আর পিঙ্গল ঘাসের গায়ে লেপ্টে থাকা প্রায় ফুরিয়ে আসা দুপুর যেন থমকে আছে, গাছের পাতা নড়ে না, তামাটে রং এর উপুড় হয়ে থাকা বিশাল সরার মতো আকাশের নীচে শেষ অক্টোবরের পৃথিবী যেন চুপ করে আছে।


কিছু কিছু গল্পে পরাবাস্তবতার ছাঁচে ঢেলে তিনি নিরীক্ষা করতে চেয়েছেন, “যাত্রী” গল্পের মত। নিঃসঙ্গতার বীভৎস রুপ এই গল্পে প্রকট হয়ে উঠেছে, আর কেন জানি মনে হয়েছে, এই নিঃসঙ্গতাটুকু লেখক বোধকরি প্রশ্রয়ই দেন, একে তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করেন, এর নির্যাসটুকু আহরণ করেন যতনভরে। বন্দী দুঃসময় ঠিক এই ধাঁচের আরেকটি গল্প, ক্লিশে প্রাত্যহিকতায় খাবি খেতে থাকা একজন মানুষ চেনা গন্ডিতে ঘুরপাক খেতে থাকে অবিরত, সে পালাতে চায় কিন্তু সে পথের দিশা তার মেলেনা। এদিক দিয়ে বরং অন্ধ তীরন্দাজ ও সম্পর্ক গল্পে এসে লেখক অনেকটাই থিতু হয়েছেন, ডানা মেলা ভাবনাগুলোর রাশ সময়মাফিক টেনে ধরেছেন। চরিত্রগুলো এই দুটি গল্পে ন্যায্য বিকাশ পেয়েছে, অনাবশ্যক ডিটেইলে গল্প ভারাক্রান্ত হয়ে পড়েনি।"অন্ধ তীরন্দাজ" গল্পে একদল বেদিশা যুবকের ছাইচাপা হতাশা, বা "সম্পর্ক" গল্পে দুই বন্ধুর পুনর্মিলনীর পরবর্তী ধেয়ে আসা বাস্তবতা নির্মাণে লেখক অনেকটাই সংযত, বরং বলা ভাল অনেকটাই সফল। অথচ দৃশ্যকল্পের প্রতি স্বভাবজাত মুগ্ধতার আঁচ এখানেও পাওয়া যায়, কিন্তু কখনোই তা বেসুরো হয়ে উঠেনা, বরং কায়েস আহমেদকে ঘিরে মনোযোগী পাঠকের প্রত্যাশার পারদ ক্রমেই চড়তে থাকে।



তথ্যসূত্রঃ

কায়েস আহমেদ সমগ্র,প্রকাশক-মাওলা ব্রাদার্স,ঢাকা।
রচনাসমগ্র ৩-আখতারুজ্জামান ইলিয়াস।

2 comments:

ভাঙ্গা পেন্সিল said...

কায়েস আহমেদকে ভীষণ কঠিন মনে হচ্ছে অদ্রোহের কঠিনতর রিভিউ পড়ে :P

অম্লান মোসতাকিম said...

ভাঙ্গা পেন্সিল এই কথা বললে ক্যাম্নেকী?

অন্ধের স্পর্শের মতো চলে গেলেন শঙ্খ ঘোষ

 সব কবিদের গদ্য সুন্দর হয় না। কেউ কেউ আছেন যাদের দুই হাতে একসঙ্গে বাজে কবিতা আর গদ্যের যুগলবন্দি। শঙ্খ ঘোষের গদ্যই সত্যিকার অর্থে পড়েছিলাম আ...