Wednesday, September 15, 2010

নো ইঞ্জিনিয়ারিং ওনলি ফুটবল"

১.

খোমাখাতায় নটঘট করতে করতে হঠাত একটা বিটকেলে গ্রুপ চোখে পরল, "নো ইঞ্জিনিয়ারিং ওনলি ফুটবল" , ভাবলাম, এ আবার কেমনতরো গ্রুপ রে বাবা। বলতেই হবে, ঢুঁ মারতেই মনটা আনচান করে উঠল, আরে এ যে আমাদের মত পথ ভুলে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে চলে আসা ফুটবল ফ্যানাটিকদের জন্যই। দেরি না করে চটজলদি জয়েন করে ফেললাম। আর সবকিছু একপাশে থাক, কিন্তু ফুটবল না হলে আমাদের যে একেবারেই চলেনা!
২.

টানা তিন তিনটি ক্লাস শেষ করে আমরা তখন হেদিয়ে পড়েছি, কেউ কেউ কড়া করে একদফা ঘুম দিয়ে দিয়েছে অলরেডি। কে যেন এর মাঝে বেমক্কা বলে উঠল, ওই পোলাপান, বাইরে তো বৃষ্টি পড়তাসে, চল মামা মাঠে। কেউ কেউ দোনোমোনার ভাব দেখাচ্ছিল, কিন্তু পাগলকে সাঁকো নাড়াতে নিষেধ করলে আখেরে কী হয় সেটা তো জানেনই। আর যায় কোথা, সবাই এক ছুট মাঠে। এর মাঝে কেউ আবার শর্টস আনতে হলে ছোটাছোটি করে, কেউ আবার শর্টসের তো বটেই, এক্সট্যাসির বাহারি শার্টেরও নিকুচি করে মাঠে নেমে পড়ে। কাদাভরা মাঠে শেষমেশ হাস্যকর একটা খেলা হয় বটে, কিন্তু তার পরোয়া করে কে? কেউ কেউ আবার বেনসন-গোল্ডলিফের বদৌলতে নিজের ফুসফুসের বারোটা বাজিয়ে সারমেয়র মত জিভ বের করে হাঁপাতে থাকে, আবার কেউ গোলের সামনে বাংলা সিনেমার নায়ক-নায়িকার দূরত্বে থেকেও লুকা টনির দক্ষতায় নির্বিবাদে বলটা বাইরে পাঠিয়ে দেয় আর কপট দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, মামা, এই মৌসুমে ফর্ম নাইক্কা; দেখিস ! পরের বার ঠিকই গোল দিমু। আমরা মুচকি হাসি, আর কিছু বলার ফুরসত পাইনা, একটু পরেই সেশনাল , এখনো টপ শীট লেখা হয়নি, দৌড়, দৌড়...

৩.

"ওই ফারুক ভাই, একটা বেনসন আর ডিউ"- হাঁক মেরে বলে তমালভাই আমাকে বোঝানোর চেষ্টা করেন, মিয়া কীসব বালছাল টিম সাপোর্ট কর- একটা প্লেয়ারও কিনতে পারলানা এই সিজনে। ওই বুইড়া স্কোলস আর গিগসরে দিয়া আর কয়দিন। তোমগো ফার্গুসনের খেল খতম, এক পাও দিয়া রাখসে কবরে- অর টাইম শেষ।

আমিও পাল্টা জবাব দিতে ছাড়িনা- ধুর মিয়া। ওইসব চেলসি-টেলসির বেইল নাই। এত টাগ অফ ওয়ারের পরও নেইমারকে কিনতেও পারলেননা, আবার কথা বলেন । কার্ভালহোর রিপ্লেসমেন্ট কে হবে দেখা যাবে নে, আর টেরি তো ভাই ওয়ার্ল্ডকাপে যা দেখাইলো, এখন অর উচিত আগে ওয়েইন ব্রিজের হাত পা ধরে মাফ চাওয়া। অন্যের বউ পটিয়ে আর কইদিন।

স্পর্শকাতর স্থানে খোঁচা দেওয়ায় এবার তমাল ভাই তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠেন- ওই, টেরির পার্সোনাল অ্যাফেয়ার্স নিয়া কথা কইবানা, তোমাদের এককালের পেয়ারের রোনালদো কি নিজে কম লুইচ্চা নাকি? হালায় পোলা জন্ম দিসে, এখন কইতাসে ওইটার মা নাই।

ওদিকে মারুফ সশব্দে হেসে উঠলে তমাল ভাই আরো খেঁকিয়ে ওঠে- ওই মিয়া, তুমি হাসো ক্যান। এইটা হল, ক্ল্যাশ অব দ্য টাইটান্স। তোমগো ফকিরেরপুল সাপোর্টাররা এখানে আউট অফ সিলেবাস।জো কোল নাকি ওদের নয়া মেসি, শুইনা হাসমু না কানমু।

মারুফের মুখ আমসি হয়ে যায়, তবে জবাব দিতে সে কিছুমাত্র কসুর করেনা- হ, প্রিমিয়ার লিগের সবচে সাকসেসফুল দল কিন্তু আমরা। দুদিনের বৈরাগী, ভাতরে কয় অন্ন।

এভাবেই একের পর এক বেনসন ধোঁয়া হয়ে হাওয়ায় মিলিয়ে যায়, আর একটু পর পর ডাক পড়ে- কালীদা, এদিকে এক কাপ চা। আর ফুটবলাড্ডা আরো জম্পেশ হতে থাকে, নিমিষের মধ্যে প্রসঙ্গ থেকে প্রসঙ্গান্তরে আলোচনা চলতে থাকে। ওদিকে একটু পর আবির হাঁক পাড়ে- বস, দ্রগবা গোল দিসে।

তমাল ভাই তার জন্ডিসাক্রান্ত হলদে দাঁতের পাটি বিকশিত করে বলে- ল মিয়া, যাই, খেলা শুরু হইয়া গেসে। আমার মুখ তেতো হয়ে যায়, মনে মনে চেলসির সাপোর্টারদের পিন্ডি চটকাতে চটকাতে আমি কমনরুমের দিকে এগোতে থাকি।

৪.

ঈদ মৌসুমে আড্ডাটা বেশ ভাল জমে। সব পুরনো বন্ধুদের সাথে মোলাকাত,কথাবার্তা এদিক ওদিক গড়িয়ে শেষ পর্যন্ত আড্ডার টপিক ওই একটাই, ফুটবল। স্পেনের সাথে আর্জেন্টিনার প্রীতি ম্যাচে জয়ের পর একদফা ম্যারাডোনাকে কষে গালাগাল করা হয়, সবাইকে সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত দেয়, নাহ! বাতিস্তা কোচ হিসেবে বোধহয় টিকেই গেল। জানেত্তি- ক্যাম্বিয়াসোকে না নেওয়াটা কত বড় ট্যাকটিকাল ভুল ছিল সেই পুরনো লেবুও এইফাঁকে দস্তুরমত চটকানো হয়ে যায়। কেউ মরিনহোকে জাদুকর বলে সাব্যস্ত করে, আর বাকিরা (পড়তে হবে বার্সার সাপোর্টাররা ) রিয়ালের সংশ্রবে মরিনহোর খেল খতম- এমন ঘোষণাও দিয়ে বসে। সব মিলিয়ে ঈদ পরবর্তী আড্ডাটা অবধারিতভাবে একটি ফুটবলাড্ডায় পর্যবসিত হয়,
খড়গ হাতে সমানে রাজা উজির নিধন করে চলি আমরা।

৫.

খোমাখাতা থেকে গ্রুপের শেষ লাইনকটি কিঞ্চিত পরিমার্জন করে বলা যায়- আসলেই, হলে এখন পেল্লায় প্লাজমা টিভি এসে পড়েছে, গোল বিন্দু কম , লাইভস্কোরে আমরা এখন বুঁদ হয়ে থাকি, ম্যাচের পর খোমাখাতায় একেকজন কাগুজে বাঘের হুংকার ছাড়ি, কিন্তু একসাথে খেলা দেখা, ক্যান্টিনে ফুটবল নিয়ে তক্কো থেমে থাকেনা। শেষ পর্যন্ত আমরা কিন্তু একই পথেরই পথিক, এই চর্মগোলকের সাথেই আমাদের নিত্য বসবাস, সে মাঠেই হোক, খোমাখাতায় হোক, বা কমনরুমে।

Wednesday, September 8, 2010

একছটাক কায়েস আহমেদ-২

প্রথম গল্পগ্রন্থ "অন্ধ তীরন্দাজে" আমরা যে কায়েস আহমেদকে দেখতে পাই, তার সাথে গল্পগ্রন্থ -লাশকাটা ঘরের কায়েস আহমেদের মেলাতে গেলে আমূল চমকে যেতে হবে। আগের সেই অবিন্যস্ততা, খ্যাপাটেপনা ঝেড়ে ফেলে এখানে তিনি অনেকটাই থিতু, বিষয়প্রকরণেও সমান মনোযোগী। গল্প বলার সহজাত ঢংকে তিনি খাপছাড়া তলোয়ারের মত ঝলকে ঊঠতে দেননি, তাকে শাণিত করেছেন যতনভরে, দেখিয়েছেন অসামান্য পরিমিতিবোধ। ইলিয়াস তার এই দ্বিতীয় গল্পগ্রন্থ সম্পর্কে নিজের উচ্ছ্বাস চাপা দিতে পারেননি, প্রগলভ সুরেই বলেছেন-

[i]মানুষের নানা রকম বেদনাকে তিনি দেখতে পান সামাজিক ও রাজনৈতিক সংকটের অজস্র বিস্ফোরণ বলে। এখানে মানুষের কেবলই মার খাওয়ার অসহায় বেদনাবোধ নেই, রোগের চিকিৎসা করতে সংকল্পবদ্ধ মানুষকেও এখানে পাওয়া যায়।"[/i]

কায়েস আহমেদের সততাকে ইলিয়াস মূল্যায়ন করেছেন বিরল হিসেবে। এখানে পাঠক সওয়াল পুছতে পারেন এই সততার সংজ্ঞা কী? সে উত্তরও ইলিয়াস বাতলে দিয়েছেন- কাহিনির নামে কেচ্ছা ফাঁদার লোভকে বিসর্জন দিতে পারাটাই কায়েস আহমেদের সততা। বারোয়ারি প্লটের ক্লিশে বয়ানের প্রতি লেখকের যে গাত্রদাহ, গড্ডলিকা প্রবাহের স্রোতে গা ভাসিয়ে দেওয়ার বিমুখীতা, সেটাও কিন্তু ঝলক দিয়ে উঠেছে তার এই গল্পগ্রন্থটিতেই।

লাশকাটা ঘর-বেশ কিছু কারণেই একটি স্বতন্ত্র আলোচনার দাবি রাখে। নকশালবাড়ি আন্দোলনের এমন জাজ্বল্যমান চিত্র আমার স্বল্প এলেমে সমসাময়িক অন্য কোন বাংলাদেশি লেখকের এলাকায় এমনভাবে উঠে এসেছে কিনা জানা নেই। এই ব্যাপারে কায়েস আহমেদ রীতিমত বিশিষ্টতার স্বাক্ষর রাখেন । বিশেষ করে মহাকালের খাঁড়া, নিয়ামত আলীর জাগরণ, দুই গায়কের গল্প আর লাশকাটা ঘর গল্পগুলো ক্ষয়িষ্ণু নকশাল আন্দোলনের অসঙ্গতিকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। শ্রেণিশত্রু কতলের নামের মারণঘাতী হুজুগ আখেরে তাই একটি আদর্শের অন্তসারশুন্যতাকেই ফুটিয়ে তোলে।

মহাকালের খাঁড়া গল্পে ভরত তার বৈধ ব্যবসার তলে কালোবাজারি করে বেশ দুপয়সা কামিয়ে নিয়েছে। কিন্তু তার মনে জুজু বাসা বেঁধেছে, চরমপন্থীরা তার মত মালদারদের আকছার মৃত্যুর সবক পাঠাচ্ছে। এসব নিয়ে সে ভয়ানক উদ্বিগ্ন, ছেলে সুরেনকেও আজকাল ভরত পারলে অহর্নিশ চোখে রাখে। সুরেন সেদিনের মরদ, সে যখন বলে এসব ফরমান তো কেবল পার্টির সাথে জড়িতদেরই পাঠাচ্ছে, তখন পোড় খাওয়া ভরত খেঁকিয়ে ওঠে-

[i]এই তোর বুদ্ধি। পার্টি করিস আর না করিস, তুই ভরত কোলের ছেলে, ভরত কোলে ওদের চোখে শ্রেণী শত্রু,‌ এখন বুঝলি রে গাড়োল। রাস্তায় চলিস কি চোখ বন্ধ করে?[/i]

বোঝা যায়, নকশালপন্থীদের খড়্গ আজকাল আমজতাকেও রেহাই দেয়না, মালদার হলেই ওদের রক্তচক্ষুতে পরিণত হতে হবে।শেষমেশ ভরতকে নিজের একমাত্র ছেলেকে খুইয়ে চরম মূল্যটা দিতেই হয়,এই ঘটনার বর্ণনা যেন অনেক বেশি জান্তব-

[i]সুরেনের লাশকে ঘিরে ভিড়, ঠেলাধাক্কা এবং হৈ চৈ রত কয়েকটা মানুষ ঘরে দাঁড়িয়ে যায়। জায়গাটায় হঠাৎ করে নিঃশ্বাসরুদ্ধ নীরবতা নেমে আসে। মধ্যরাত্রির উন্মুক্ত আকাশতলে সেই স্তব্ধতার মধ্যে শোকোন্মত্ত পিতার "বা বা সু রে ন রে" এই ত্রিভুবন ভাসানো সর্বভেদ্য হাহাকার, ও তার বিপুল বেগে ধেয়ে আসা - খালি গায়ের ছোটখাট গোলগাল মানুষটিকে অবর্ণনীয় বিশালত্ব এনে দেয়।[/i]

দুই গায়কের গল্পে অবশ্য এই সুরটা এত প্রকটভাবে আসেনি।ভাগ্যের ফেরে জগন্নাথ চোখ হারিয়ে ঠুঁটো, সাগরেদ হরিদাসকে নিয়ে দিনমান সে গান গেয়ে বেড়ায়, আর সেটাই তাদের জীবিকা। তবে হরিদাস আবার একেবারে সুস্থ-সবল মরদ, কিন্তু তার জগন্নাথের শিষ্যত্ব নেওয়ার কারণ এক দুর্জ্ঞেয় রহস্য। হরিদাসের সংসার আছে, কিন্তু সংসারে থেকেও যেন সে সন্ন্যাসী।জগন্নাথ ওরফে জগার আবার এসবের বালাই নেই, মাঝে মাঝে "লীলা" করার বদখেয়াল ছাড়া সে সংসারে জড়ানোর তাগিদ খুব একটা অনুভব করেনা। একসময় দৈব দুর্বিপাকে মানিকজোড়ের বাঁধন ছিড়ে যায়, কারো সাতে পাঁচে না থাকা হরিদাস নকশালিস্ট-পুলিশের গোলাগুলিতে বেঘোরে প্রাণ হারায়। আর আপাত নির্লিপ্ত জগার মধ্যে ঘুমিয়ে থাকা আগ্নেয়গিরি জেগে ওঠে, কিন্তু্ তাতে কি লাভ হয় আদৌ ?-

[i]এই অন্ধকার ফাটানো চিৎকার দিয়ে সে মাটি থেকে উপরে উঠে যায়। দু'হাতে উত্তোলিত হারমোনিয়াম ছুটে যায় সামনে। জগন্নাথের শরীর শুন্যে একটি মোচড় খায়। ধনুকের মত ব্যাঁকে; তারপর; যেনো ধনুক থেকে তীর ছুটে গেলো, জগন্নাথ সমস্ত শরীর দিয়ে পৃথিবী বিদ্ধ করে।[/i]

নিয়ামত আলীর জাগরণও একই ছাঁচে ঢালা গল্প। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধফেরতা নিয়ামত নিজেকে একজন সৈনিক হিসেবে দাবি করে, খাকি কোত্তা গায়ে দিয়ে বেশ একটা ভড়ং ধরে। মানুষজন তার এসব স্তোকে অবশ্য বিভ্রান্ত হয়না, নিয়ামতকে তারা বিবেচনা করে স্রেফ একজন অকর্মণ্য জড়ভরতের সাথে। নিয়ামতও এসবের থোড়াই কেয়ার করে। কিন্তু ভাগ্যের ফেরে সেও ভুল সময়ে ভুল স্থানে থাকার খেসারত দেয়, নকশালপন্থি হিসেবে তাকে পাকড়াও করা হয়। নিজের খেয়ালে মগ্ন নিয়ামতও এই নকশাল জুজু থেকে রেহাই পায়না।

এই গল্পগ্রন্থের সবচেয়ে অভিনব গল্প সম্ভবত -মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পৈতৃক ভিটে ও মালপদিয়ার রমণী মুখুজ্জে গল্পটি। দুজন অনুসন্ধিৎসু মালপদিয়া গ্রামে যায়-মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঠিকুজির খোঁজে।মানিকের পূর্বপুরুষ এই গ্রামেই আস্তানা গেড়েছিলেন, সেই আস্তানার সুলুক সন্ধানে আসা যুবকদের উদ্দেশ্য সম্পর্কে শুরুতে ভ্রুকুটি তোলে গ্রামের মানুষ। একসময় সেই ভ্রান্তি অপনোদিত হয়, মানিকের পৈতৃক বাড়ির সন্ধানও তারা পেয়ে যায়। কিন্তু নিজেদের অজান্তেই আগন্তুকেরা এরচাইতে বড় আবিষ্কার করে ফেলে, সংখ্যালঘু মানুষের নিরাপত্তাহীনতা- সংকট সবকিছুই তাদের সামনে আচমকা বিমূর্ত হয়ে ওঠে। প্রথম দর্শনে এই গল্পটিকে একটি আটপৌরে প্রতিবেদন হিসেবে ভ্রম হতে পারে, কিন্তু লেখক গল্পটিতে প্রায়ই নিজের প্রাজ্ঞ রাজনীতি ও সমাজ মনস্কতা জানান দিতে ভোলেননি। দেশভাগের ছোবল থেকে যে কেউই রেহাই পায়নি, এ সত্য ও ভসে ওঠে তাদের সামনে। পলায়নপর মধ্যবিত্ত বা পোড়খাওয়া কৃষিজীবি সকলেই আদতে একই নৌকারই যাত্রী-

[i]অর্থাৎ ভিন্ন একটি সম্প্রদায় যখন শাসন নিয়ন্ত্রণের নিয়ন্তা হয় , তখন শ্রেণীর পার্থক্য ,বর্ণের পার্থক্য ছাপিয়ে সংখ্যালঘুর সামনে প্রবল হয়ে দাঁড়ায় সেই ভিন্ন সম্প্রাদায়ের সাথে নিজেদের সম্প্রদায়গত পার্থক্য, সেখানে "মুখুজ্জেদের" সাথে "মণ্ডলদের" কোন ভেদ নেই।এই বিভাজিত চেতনার ভিত্তিতেই এই উপমহাদেশের রাজনীতি পরিচালিত হয়ে এসেছে। বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদ ভিত্তিক স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হলেও এই সাম্প্রাদায়িক ভেদবুদ্ধির প্রবল মূঢ অন্ধকারের প্রতপক্ষ হিসাবে সুস্থ সবল দৃঢ-ভিত্তিক কোন মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠিত হয়নি। কেন হয়নি ? সে অনেক কথা। সে কথা থাক।[/i]

মোদ্দা কথাটা লেখক অকপটে এভাবেই বলে দিয়েছেন ,কোন ছলচাতুরীর আশ্রয় না নিয়েই। ফলে মানিকের ভিটেমাটি পাওয়ার চেয়েও এই ব্যাপারটি মুখ্য হয়ে দাঁড়ায়।

লাশকাটা ঘর গল্পে লেখক মানুষের থিতিয়ে পড়া সম্পর্কগুলোকে আতশ কাঁচের নিচে ফেলেছেন, বারবার নিরীক্ষা করেছেন। কালীনাথ-নিশিকান্ত-মনোতোষ মাস্টার বা বাসুদেবরা তো আসলে একই পথেরই পথিক, তাদের সকলেরই হাড় মাংসে পচন ধরেছে, অভাবের সাথে যুঝতে থাকা মানুষগুলো প্রত্যেকেই এখন শবঘরের একেকজন বাসিন্দা, আর খানিক পরেই হয়ত তাদের মনুষ্যত্বের ব্যবচ্ছেদ করা হবে। তারা এ থেকে উত্তরনের পথের হদিস করে, কিন্তু সে পথ আর মেলেনা।

গল্পগ্রন্থের অন্যান্য গল্পগুলো অবশ্য কী ভারে, কী ধারে এগুলোর মত কাটেনা। তার মধ্যেও কিছু কিছু গল্পের হকিকত আলাদাভাবে দিতেই হয়। "গগনের চিকিৎসা তৎপরতা" গল্পে গগন চাঁদের কলংক দূর করার দাওয়াই খোঁজে, দাওয়াইয়ের সন্ধান না পেলেও আমরা জানতে পারি, চাঁদেরও কলংক এতদিন হয়ত ঘুঁচে যাবে ,কিন্তু মানুষের কলংক, সে দিল্লি দূর অস্ত।

অন্যদিকে "গোপাল কামারের তলোয়ার" গল্পে লেখক বেশ কায়দামতো তারিয়ে তারিয়ে একটা জম্পেশ গল্প ফাঁদার চেষ্টা করেন, গোপাল কামারের নিস্পৃহতাকে ফুটিয়ে তোলেন, কিন্তু অন্য গল্পগুলোর তুলনায় এই গল্পের ভঙ্গিটি অনেক জোলো হয়ে যায়।সে তুলনায় "নচিকেতাগণ" গল্পে লেখক অনেক সাবলীল, মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে লেখা একমাত্র গল্প এটি। হানাদারদের হাতে অন্তরীণ একদল লোক, যারা জানে হয়তো খানিক পরেই তাদের খতম করে দেওয়া হবে, তারপরও তাদের কেউ মিথ্যে ফানুসের বুদুবুদ রচনা করে, ভাবে- হয়তো তাদের ছেড়ে দেওয়া হবে।এই ভাবনাটা ধরা পড়ে এভাবে-

[i]রাত শেষ হয়ে আসছে, একটু পরেই ভোরের আলো এসে পড়বে ভেন্টিলেটরের ফাঁকে, সেই সঙ্গে আসবে চড়ুইটা, কদিন থেকেই লক্ষ্য করছি আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে ছোট পাখিটা এসে ডাকাডাকি করে ভেন্টিলেটরে বসে; দেখে এই অপরিসর এই বাথরুমটায় তালগোল পাকিয়ে কজন মানুষ পড়ে আছে। কি বোঝে কে জানে খানিকক্ষণ লাফালাফি ডাকাডাকি করে আবার উড়ে যায় বাইরে। আমি তার অবাধ উড়ে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকি, ভেন্টিলেটরের ওপারের ফাঁকা আলোকিত শুন্যতা বিশাল পৃথিবীটার আভাস দেয়।

[/i]


প্রতারক জোছনা বা পারাপার গল্পে লেখক আবার অনেকটাই মনস্তাত্ত্বিক, মানুষের একাকিত্বই গল্পগুলোর উপজীব্য। তবে মাওলা ব্রাদার্স প্রকাশিত এই গল্পগ্রন্থের একটাই খুঁত, একই গল্প আলাদা নামে দুবার থাকা। "ফজর আলীর গল্প" ও "নিরাশ্রিত অগ্নি" আদতে একই গল্পই, তবে ছাপা হয়েছে দুবার। এই গল্পটিতে লেখক ডিটেইলে অসাধারণ স্বচ্ছন্দ-

[i]একথা মাথায় আসার সঙ্গে সঙ্গে তার চোখের সামনে একটা সবুজ গাছ ঘুরতে ঘুরতে দূর থেকে কাছে আসতে থাকে, ধীরে ধীরে তার নীচে সাদা, নীল, কতগুলো রঙ জেগে ওঠে, রংগুলো আরো স্পষ্ট হয়ে একসময় জামাকাপড় কি খালি গায়ের কতগুলো মানুষ হয়ে যায়... [/i]

এভাবেই কায়েস আহমেদ আমাদের নিয়ে যান গল্পের এক কুহকময় জগতে, মোহমুগ্ধ পাঠককে গাছে তুলে তিনি আলগোছে মই কেড়ে নেন, আর পাঠক এক অনিঃশেষ বারুদে ঠাসা এক গল্পজগতে খাবি খেতে থেকে।

নিরীক্ষা-১

লোকটা অনেকক্ষণ থেকে কী যেন খুঁজছে।

জায়গাটায় বেশ একটা সুনসান নীরবতা, লোকজনের বেমক্কা হল্লার উটকো আওয়াজ এখানে চট করে কানে লাগেনা। কেমন যেন থম মেরে আসা নীরবতায় চারিদিক আচ্ছন্ন হয়ে আছে। হিজল গাছটা বুড়িয়ে গিয়েছে, তাকে এখন চেনা দায়, মাছারাঙ্গাটিও আর এখানে অলস ঝিমোয়না। কোন জ্বিন-ভূত আসর করেছে কীনা তাই বা কে বলতে পারে? খানিকটা তফাতে একটা খোলামতন জায়গা, সেখানে বেলা গড়ালে ছেলেপেলের দলের মচ্ছব বসে। এদিকে নিচু হয়ে দাঁড়ালে পানিতে ছায়া দেখা যায় বটে, কিন্তু সেটা বড়ই আবছা। পানিটা টলটলে নয় মোটেও, কিনার ঘেঁষে নেমে পড়লে গোড়ালি অবধি পা ভেজে কীনা সন্দেহ। তবে পাড় ঘেঁষে সন্তর্পণে হেঁটে গেলেও দুচারটা বনবিছুটির দঙ্গল না মাড়িয়ে পারা যায়না। তার মধ্যে আবার নাম না জানা পিঙ্গল ফুলের ঝোপ। এখন ভরা মৌসুম, কদিন থেকেই বৃষ্টিবাদলার ধুম পড়েছে। পাড়টা বেশ কাদাটে হয়ে আছে, ঠাহর করে না চললে একেবারে ধরাশায়ী হওয়ার আশঙ্কা থাকে । লোকটা অবশ্য এসবের থোড়াই কেয়ার করে। কিন্তু তার বারবার মনে হতে লাগল, হিসেবে কোথাও বিলকুল গরমিল হয়ে গেছে, কিছু একটা কিছুতেই মিলছেনা। সবকিছু ঠিকঠাক আছে, আবার কোন কিছুই যেন ঠিকঠাক নেই। লোকটা খানিক নি পানির দিকে নির্নিমেষ তাকিয়ে থাকে, দলা পাকিয়ে ওঠা বিভ্রান্তিগুলোকে ঠিকঠাক করার চেষ্টা করে। তারপর একসময় হাল ছেড়ে দেয়, কিছু একটা খুঁজতে থাকা লোকটা ফের হাঁটতে শুরু করে। পেছনে পড়ে থাকা কিছু না চুকানো হিসেব -নিকেশ।

Saturday, September 4, 2010

একছটাক কায়েস আহমেদ-১

তাঁর সাথে আমার পরিচয় কোন এক ঘোরতর দাবদাহের দিনে। আজিজের সামনে দিয়ে যাচ্ছিলাম, ঢুঁ মারার লোভটা বরাবরের মত সংবরণ করতে পারলামনা। দোকানে থরে থরে সাজিয়ে রাখা বইগুলোকে আলগোছে চেখে নিচ্ছিলাম। পকেটের অবস্থা তখন গড়ের মাঠপ্রায়, তাই চাখতেও হচ্ছিল রয়েসয়ে, পৃথুল বইগুলোর লোলুপ প্রলোভন এড়িয়ে ক্ষীণবপুগুলোর দিকে। হঠাৎ করেই হলুদ মলাটের একটি বইয়ের ওপর নজর আটকে গেল। বলে রাখা ভাল, খানিকটা অবাকই হলাম ফ্ল্যাপ উলটে, মোটে ২৮৬ পৃষ্ঠার বইয়েই কীনা এই লেখক তার সব কথা বলে গেছেন। আরো কদ্দুর গিয়ে দেখি রচনাসমগ্রের ভূমিকা লিখেছেন খোদ আখতারুজ্জামান ইলিয়াস। নাহ! অবশিষ্ট দ্বিধাটুকুকে ঝেড়ে ফেলে চটজলদি বইটা বগলদাবা করে নিলাম। কায়েস আহমেদের সাথে আমার অযাচিত পরিচয়টা এভাবেই।

একজন লেখকের বলার খুব বেশি কিছু থাকতে পারেনা, একথা আমি কায়মনোবাক্যে মানি। তারপরেও বলতেই হবে, কায়েস আহমেদ একটু বেশিই স্বল্পপ্রসূ লেখক। সমকালীন বাংলা সাহিত্যের তিনি মোটেই কোনো দিকপাল নন, প্রচারের শীর্ষে থাকা দৈনিকের রগরগে সাহিত্য পাতায় তাঁকে নিয়ে আদিখ্যেতাও করা হয়না মোটেই, বইমেলার চটকদার সব বইয়ের মাঝে তাঁর দুই মলাটে আবদ্ধ সাহিত্যকীর্তিকে খুঁজে পাওয়াও ভার হবে। এতকিছুর পরেও কায়েস আহমেদকে অস্বীকার করা যায়না, তাঁকে বাংলা সাহিত্যে স্বতন্ত্র একটি ঠাঁই দিতেই হয়। কেন? এ সওয়ালের হদিস পেতে হলে আমাদের একটু সামনে যেতে হবে।

একটা কথা হলফ করে বলা যায়, বাজারি সাহিত্যের পলকা রোশনাই কায়েস আহমেদকে কখনো টলাতে পারেনি। তিনি লিখেছেন কম, কিন্তু যে চেতনাকে তিনি ধারণ করেছেন , যে বিশ্বাস তাকে রসদ যুগিয়েছে, তার দ্যুতি তাঁর রচনা থেকে হামেশাই ঠিকরে পড়েছে। ইলিয়াস “ মরিবার হ’লো তার সাধ” প্রবন্ধে তাঁকে নিয়ে বলতে পেরেছেন,

প্রতিষ্ঠা ও খ্যাতি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বেশিরভাগ লেখকের কাছে লেখাটা হল অভ্যাসমাত্র-চাকরিবাকরি আর ব্যবসাবাণিজ্য আর দেশপ্রেমের ঠেলা সামলাতে এনজিও বানিয়ে মালপানি কামাবার সঙ্গে তখন এর কোনো ফারাক থাকে না। তখন লেখায় নিজের সুখ আর বেদনা জানান দেওয়াটা হয়ে দাঁড়ায় তেল মারা আর পরচর্চার শামিল। লেখক হিসেবে সেই সামাজিক দাপট কায়েসের শেষ পর্যন্ত জোটেনি। তাই, কেবল মানুষের খুঁত ধরে আর দুর্বলতা চটকে সাহিত্যসৃষ্টির নামে পরচর্চা করার কাজটি তাঁর স্বভাবের বাইরেই রয়ে গেল। আবার “এই দুনিয়ায় সকল ভালো/ আসল ভালো নকল ভালো...” এই ভেজাল সুখে গদগদ হয়ে ঘরবাড়ি, পাড়া ,গ্রাম, সমাজ ,দেশ, পৃথিবী, ইহকাল ও পরকাল সবকিছুতেই তৃপ্তির উদ্গার শুনিয়ে মধ্যবিত্ত পাঠকদের তেল মারার কাজেও তিনি নিয়োজিত হননি।


ষাটের দশকের ছোটগল্পের ভরা জোয়ারের প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন কায়েস আহমেদ। তবে বাঁধাগতের জোয়ারে তিনি গা ভাসিয়ে দেননি, নিজের বিশিষ্টতাকে তিনি সযত্নে লালন করেছেন, লকলকিয়ে একে বেমক্কা বেড়ে উঠতে দেননি। তাঁর প্রথম ছোটগল্পগ্রন্থ “অন্ধ তীরন্দাজ” এই সাধনারই ইঙ্গিতবাহী। তবে লেখক হিসেবে তিনি এই গ্রন্থে যথেষ্ট পরিমিতিবোধের পরিচয় দিয়েছেন, এমন বলাটা ভুল হবে। তিনি প্রায়শই নিরীক্ষা করেছেন, কারণে বা অকারণে, কিন্তু মাঝে মাঝেই তিনি খেই হারিয়েছেন, গল্পগুলো যেন দিকভ্রষ্ট হয়ে পড়েছে, কদাচিত কোন কানা গলিতে গিয়ে গোত্তা খেয়েছে। কাহিনির প্রতি, ডিটেলসের প্রতি তার মোহগ্রস্ততার কারণে চরিত্রগুলোর সহজাত পরিবৃদ্ধি তাই অনেক ক্ষেত্রেই ঠোকর খেয়েছে। তার দুর্দান্ত কিছু প্লটও ঠিক একই কারণে হয়ে উঠেছে বক্তব্যপ্রধান। তবে ডিটেলসে তাঁর অত্যাগ্রহ যে অমূলক নয়, সেটা কিন্তু মাঝেমাঝেই বিমূর্ত হয়ে উঠেছে, ঝিলিক দিয়ে উঠেছে-



গাছপালার ফাঁকে ফাঁকে, জন্ডিস রোগীর মতো ফ্যাকাশে, ক্রমাগত নিঃশোষিত হয়ে আসতে থাকা বনতুলসী, চিচ্চিড়ে, আশ শ্যাওড়া বন আর পিঙ্গল ঘাসের গায়ে লেপ্টে থাকা প্রায় ফুরিয়ে আসা দুপুর যেন থমকে আছে, গাছের পাতা নড়ে না, তামাটে রং এর উপুড় হয়ে থাকা বিশাল সরার মতো আকাশের নীচে শেষ অক্টোবরের পৃথিবী যেন চুপ করে আছে।


কিছু কিছু গল্পে পরাবাস্তবতার ছাঁচে ঢেলে তিনি নিরীক্ষা করতে চেয়েছেন, “যাত্রী” গল্পের মত। নিঃসঙ্গতার বীভৎস রুপ এই গল্পে প্রকট হয়ে উঠেছে, আর কেন জানি মনে হয়েছে, এই নিঃসঙ্গতাটুকু লেখক বোধকরি প্রশ্রয়ই দেন, একে তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করেন, এর নির্যাসটুকু আহরণ করেন যতনভরে। বন্দী দুঃসময় ঠিক এই ধাঁচের আরেকটি গল্প, ক্লিশে প্রাত্যহিকতায় খাবি খেতে থাকা একজন মানুষ চেনা গন্ডিতে ঘুরপাক খেতে থাকে অবিরত, সে পালাতে চায় কিন্তু সে পথের দিশা তার মেলেনা। এদিক দিয়ে বরং অন্ধ তীরন্দাজ ও সম্পর্ক গল্পে এসে লেখক অনেকটাই থিতু হয়েছেন, ডানা মেলা ভাবনাগুলোর রাশ সময়মাফিক টেনে ধরেছেন। চরিত্রগুলো এই দুটি গল্পে ন্যায্য বিকাশ পেয়েছে, অনাবশ্যক ডিটেইলে গল্প ভারাক্রান্ত হয়ে পড়েনি।"অন্ধ তীরন্দাজ" গল্পে একদল বেদিশা যুবকের ছাইচাপা হতাশা, বা "সম্পর্ক" গল্পে দুই বন্ধুর পুনর্মিলনীর পরবর্তী ধেয়ে আসা বাস্তবতা নির্মাণে লেখক অনেকটাই সংযত, বরং বলা ভাল অনেকটাই সফল। অথচ দৃশ্যকল্পের প্রতি স্বভাবজাত মুগ্ধতার আঁচ এখানেও পাওয়া যায়, কিন্তু কখনোই তা বেসুরো হয়ে উঠেনা, বরং কায়েস আহমেদকে ঘিরে মনোযোগী পাঠকের প্রত্যাশার পারদ ক্রমেই চড়তে থাকে।



তথ্যসূত্রঃ

কায়েস আহমেদ সমগ্র,প্রকাশক-মাওলা ব্রাদার্স,ঢাকা।
রচনাসমগ্র ৩-আখতারুজ্জামান ইলিয়াস।

Thursday, September 2, 2010

প্রতিভা অন্বেষণ ও কিছু গিনিপিগ বানানোর কেচ্ছা

খানিকটা সরলীকরণ হয়ে গেলেও একটি কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়,বলতে গেলে ডেভ হোয়াটমোর নামক ওই পাকানো গোঁফের ভদ্রলোকটিই বাংলাদেশের ক্রিকেটের খোলনলচে অনেকটুকু বদলে দিয়েছিলেন।তবে পাঁড় ক্রিকেটভক্তরা আশা করি বিস্মৃত হননি,হোয়াটমোরের মস্তিষ্কপ্রসূত কিছু থিওরি কিন্তু শেষ পর্যন্ত ব্যর্থতাতে পর্যবসিত হয়।হ্যাঁ,আমি তার সুবিখ্যাত "মিডিওকার থিওরির" কথাই বলছিলাম।ব্যাটে বলের লড়াইয়ে সবকিছু মোটামুটি করতে পারে,এমন ক্রিকেটারদের দলে নেওয়ার তার খাপছাড়া নীতি শেষ পর্যন্ত যে কতটুকু সফল হয়েছিল,সেটাও নতুন করে বলবার প্রয়োজন নেই বৈকি।

ভাবছেন, কেন এতদিন পর এসব পুরোনো গপ্পো নতুন করে ফাঁদা।না না ,বাংলাদেশ ক্রিকেট টিমের ব্যবচ্ছেদ করা আমার উদ্দেশ্য নয়(সে গুরুদায়িত্ব উৎপলদার হাতেই ছেড়ে দেওয়া ভাল) আর আমি ধান ভানতে শিবের গীতও গাইছিনা।সত্যি বলতে কি,দূরদর্শন বস্তুটার দিকে আজকাল ঘেষা প্রায় হয়না বললেই চলে।কিন্তু কোন কুক্ষনে যে সেদিন টিভি দেখতে বসেছিলাম কে জানে ! এনটিভিতে দেখলাম মার্ক্স অলরাউন্ডার নামে একটি প্রতিভা অন্বেষণমূলক অনুষ্ঠান দেখাচ্ছে।বলে রাখা ভাল,এমনিতেই এসব তথাকথিত "তোমাকেই খুঁজছে বাংলাদেশ" টাইপ অনুষ্ঠানের প্রতি আমার মারাত্মক অ্যালার্জি আছে।প্রতিভা খোঁজার নামে এসব অনুষ্ঠান অনেকটাই ঠক বাছতে গাঁ উজাড় করার মত ব্যাপার বলে মনে হয়।শুরুর দিকের কিছু প্রোগ্রামকে তাও খানিকটা জাতের বলা যায়।কিন্তু পরের দিকের রীতিমত দৃষ্টিকটুভাবে একের পর এক যে হারে তথাকথিত প্রতিভাদের খুঁজে আনা হচ্ছে,তাতে কয়েকদিন বাদে দেশে প্রতিভার মচ্ছব লেগে যাবে আর এসব প্রতিভা রপ্তানি করে বেশ দুপয়সা কামানোও যাবে।সবচেয়ে হাস্যকর লাগে যখন কোমলমতি শিশুদের মর্মান্তিকভাবে এসব নাটুকেপনার শিকার হতে হয়।অনেকটা এরকমই একটি নির্লজ্জ্ প্রদর্শনীই দেখলাম সেদিন।

প্রথমত অলরাউন্ডার কথাটাতেই আমার ঘোরতর আপত্তি।ক্রিকেটীয় পরিভাষায় যে ব্যাটিং বোলিং দুটিই টুকটাক করতে পারে তাকেও কিন্তু অলরাউন্ডার বলা হয়।মজার ব্যাপার হল,মার্কস অলরাউন্ডার নামের অনুষ্ঠানটি মোটামুটি সেই ক্যাটাগরিতেই পড়ে। কোন একটা বিষয়ে স্পেশালাইজড না হয়ে সব কিছুই একটু একটু পারে এমন শিশুদেরই দেখলাম বেমালুম অলরাউন্ডার বলা হচ্ছে।তবে আমার চক্ষু চড়কগাছ হল বিচারকদের জ্ঞানগম্যির বহর দেখে।বিশেষ করে আট বছরের একটি শিশু যখন চমৎকার আবৃত্তি করে,তখন গান বা নাচ জানেনা বলে তাকে এককথায় ছেঁটে ফেলাটা কেমন বোধবুদ্ধিসম্পন্ন মানসিকতার পরিচয় দেয়, তা আশা করি বলার প্রয়োজন নেই।বিশেষ করে আব্দুন নুর তুষারের মত একজন লোক এধরনের অবিবেচক কাজ কিভাবে করেন ,সেটাই আমি ভেবে পাইনা।আর অন্যদের কথা(বিপাশা হায়াত,শম্পা রেজা ,শিবলী মোহাম্মদ)নাইবা বললাম।কোন প্রতিযোগী যদি কোন বিভাগে অপেক্ষাকৃত দুর্বল পারফর্ম করে,তাহলে তাকে এমনভাবে তাগাদা দেওয়া হয়,যেন ভাল না করাটা অপরাধ বৈ আর কিছু নয়।সবচেয়ে বড় কথা হল,সবজান্তা যে কোনকিছুতেই ওস্তাদ হয়না সে সত্য তারা কি জাননেনা,নাকি জেনেও না জানার ভান করেন ।তবে আমার মূল আশঙ্কার জায়গা এটা নয়।আরোপিত কোন কিছু কখনোই শুভ ফল বয়ে আনেনা,তা সে যতই উপাদেয় হোক না কেন। আর যে জিনিসে আনন্দ নেই,সে জিনিস যে আখেরে লাভ না করে ফ্যাকড়াই বাঁধায় তা নিয়েও বোধহয় দ্বিমতের অবকাশ নেই।আগে তো তাও এসব প্রতিভা অনুসন্ধান কেবল একটি নির্দিষ্ট ক্যাটাগরিতেই সীমাবদ্ধ ছিল।কিন্তু অলরাউন্ডার খোঁজার নামের যে প্রহসন চলছে,তার চেয়ে আত্মঘাতী আর কিছুই হতে পারেনা।
আর বিচারকেরাও কি একটিবার ভেবে দেখেননি, নিজেদের সন্তানদের গিনিপিগ বানিয়ে তাদের ওপর এহেন বল্গাহীন পরীক্ষা নিরীক্ষা কি আদৌ তাদের জন্য কল্যাণকর হবে ?


আর বলিহারি এইসব অভিভাবকদের,সব কাজের কাজী বানানোর পাঁয়তারায় যারা খুবই যত্নের সাথে নিজ সন্তানদের নিজের অজান্তেই উদ্যমহীন,অন্তঃসারশূন্য করার মত হঠকারী কাজ করতে যাচ্ছেন,সন্তানের পছন্দ অপছন্দের কিছুমাত্র ভ্রুক্ষেপ না করে "এক্সট্রা কারিকুলার অ্যাক্টিভিটিজ " নামের একের পর এক জগদ্দল পাথর চাপিয়ে দিচ্ছেন। "আরও প্র্যাকটিস,আরও প্র্যাকটিস" বলে যে মন্ত্র তাদের কানে জপে দেওয়া হচ্ছে,ভয় হয়,শেষে না এই মন্ত্রের রিভার্স অ্যাফেক্টে এসব ইঁদুর কপালে শিশুরা একসময় প্রাণশক্তিহীন যান্ত্রিক মানবে পরিণত হয় !

অন্ধের স্পর্শের মতো চলে গেলেন শঙ্খ ঘোষ

 সব কবিদের গদ্য সুন্দর হয় না। কেউ কেউ আছেন যাদের দুই হাতে একসঙ্গে বাজে কবিতা আর গদ্যের যুগলবন্দি। শঙ্খ ঘোষের গদ্যই সত্যিকার অর্থে পড়েছিলাম আ...