Friday, August 27, 2010

কালো বরফ ও আমার শৈশবচরিত

আমার জগতে তখন সাদাকালোর কোন ঠাঁই ছিলনা, পুরোটাই ছিল ভীষণ রকম রংদার। স্কুলের ঘন্টা বাজত ঢংঢং, একছুটে চলে যেতাম লালচে ইটের স্কুলমাঠে, বিকেলের ফিকে আলোয় দেখতে পেতাম যেন রংধনুর সাত রঙ। বাড়ি ফেরার সময় চারপাশটা আগাপাশতলা চেখে ফেলত আমার নবিশ চোখ; টুংটুং করে বেল বাজানো রিকশাওয়ালা, স্টেশনারি দোকানের ক্লিশে সাইনবোর্ড, অদূরের প্যারেড ময়দান কাঁপিয়ে বেড়ানো ছোকরার দল, সবকিছুই দেদারসে আনন্দ বিলিয়ে যেত, আমার মনে তখন অবারিত আনন্দের ফল্গুধারা। বিকেলটা যেন টুপ করে কেটে যেত, আমার কেবলই মনে হত হতচ্ছাড়াকে যদি আচ্ছাসে পাকড়াও করে ধরে রাখা যেত ,তবে বেশ হত। আমাদের কলোনির সামনে ছিল পুরনো ইটের স্তুপ, সেই ইটের স্তুপে চলত লুকোচুরি খেলা। একসময় হলুদরঙ আলোটা মিইয়ে আসত, মুয়াজ্জিনের জলদগম্ভীর আযান শোনা যেত একটু পরেই, আমরা দমে যেতাম ভীষণভাবে, খেলা এই সাঙ্গ হয়ে এল বলে। সেই থুত্থুড়ে পুরনো কলোনির বাতাসটাকে আমার বেকায়দা রকম গুমোট মনে হত, আঁধার জেঁকে বসার সাথে সাথে সেই ভাবটাও আরো প্রকট হত।


কালো বরফ পড়তে পড়তে এইসব কথাই ঘুরেফিরে আমার করোটিতে পাক খেতে লাগল। আমার বয়সও তখন পোকার মতই, তবে পোকার মত আঙ্গুল চোষার বাতিক বোধহয় ছিলনা। তবে পোকাকে আমি হিংসে করি, একটু বেশি রকমই। পোকার মত আমার কল্পনার পালের হাওয়া কি এত ফুলেফেঁপে উঠত। কী জানি? তবে যে অদ্ভূত ইন্দ্রজাল মাহমুদুল হক সৃষ্টি করেছেন উপন্যাসের শুরুতেই, সে ঘোর থেকে চট করে বের হওয়া খুবই মুশকিল।শুরুতেই তার নিরাসক্ত কথন-

তখন আমার অভ্যেস ছিল বুড়ো আঙ্গুল চোষার। কখনো পুকুর-ঘাটে, কখনো বারান্দার সিঁড়িতে, কখনো- বা জানালায় একা একা বসে কেবল আঙ্গুল চুষতাম। আঙ্গুলের নোনতা স্বাদ যে খুব ভাল লাগতো, ঠিক সে রকম কোন ব্যাপার নয়। তখন ভাললাগা বা মন্দলাগা এসবের কোন ঝক্কি ছিল না, যতোটুকু মনে পড়ে; পৃথিবী যে গোল, একথা শুনে কানমাথা রীতিমতো ঝাঁ ঝাঁ করতো। সে একটা গোলমেলে বিষম ব্যাপার। ভাবতাম আমরা তাহলে কোথায় আছি, কমলালেবুর তলার দিকে না ওপরের দিকে; তলার দিকের মানুষজনের তো টুপটাপ ঝরে পড়ার কথা।

এইভাবে মাহমুদুল হক ভোজবাজির যে রমরমা পসরা সাজিয়ে বসেন, আমার সাধ্য কী এই কুহকের জাল ভেদ করা? আমিও মন্ত্রমুগ্ধের মত পড়ে যেতে থাকি। মাঝে মাঝে আবছা আবছা মনে পড়ে, এরকম বিটকেলে ভাবনায় আমিও সময় সময় বুঁদ হয়ে থাকতাম। মা বলতেন, আমি নাকি প্রায়ই নানা প্রশ্নবাণে সবাইকে জেরবার করে ফেলতাম, জবাব না দেওয়া অবধি এসব উটকো সওয়াল থেকে রেহাই পাওয়ার সাধ্য নাকি কারও ছিলনা। কালো বরফ মন্থনকালে কত কথাই যে মনে আসে!এমন ভয়ঙ্কর সুন্দরভাবে কেউ কি লিখতে পারে-

হু হু বাতাসের গায়ে নকশা-তোলা ফুলের মতো অবিরল আকুলতা,পোকার বুকের ভেতরের ফাঁকা দালানকোঠা গুম গুম করে বাজে, পোকা তুই মর, পোকা তুই মর!

যা কিছু নিঃশব্দ, যা কিছু শব্দময়, যা কিছু দৃশ্যগোচর, দৃশ্যাতীত, সবকিছুই একজোট হয়ে হাত ধরাধরি করে ঘিরে ধরে; অদ্ভুত এক আব্জনার তালে তালে আস্ত একটি রাত মোমের মত গলে পড়ে, জিনজার-হিনজার জিঞ্জার-গিনজার, জিনজার-হিনজার পোকা শুনে, শুনতে পায়। পোকা পোকা হয়ে যায়।

তবে অচিরেই ভাবালুতায় চুর হয়ে আমাকে এক লহমায় মাটিতে নামিয়ে আনেন লেখক, আবদুল খালেককে সাক্ষী রেখে দাঁড় করিয়ে দেন বাস্তবতার কর্কশ জমিনে। বৈষয়িকতার সাথে ক্রমাগত যুঝতে থাকা খালেককে আশেপাশের মানুষগুলোর সাথে মেলাতে যায়, শৈশবে ফিরে যেতে খাবি খেতে হয়না আমাকে। এদিকে উপন্যাস এগোতে থাকে তরতর করে, আর আবদুল খালেক ওরফে পোকার দ্বৈত বয়ান আমাকে ধন্দে ফেলে দেয়। দুজনকে মেলাতে পারি তখন, যখন শৈশবের গিরিবালার ঝুপ করে নেমে আসে আবদুল খালেকের ভাষ্যে-

"বাইরে আকাশ বলে একটা কিছু আছে, তা জান তো ! সেখানে একটা চাঁদ আছে, গোল চাঁদ। ঐ চাঁদের ভেতর হাঁটুমুড়ে কতোকাল বসে আছে। চরকায় সুতো কাটছে বসে বসে। "

পোকা ও আবদুল খালেকের এই আজব যুগলবন্দি চলতে থাকে মেলাক্ষণ। বাবা ,মা ,মনি ভাইজান, টিপু ভাইজান, রানিবুবু,পুঁটি, কেনারাম কাকা, ছবিদিরা পোকাকে অহর্নিশ সুখস্বপ্ন দেখিয়ে যায়, তার ছোট্ট জগতে তারা একেকজন অধীশ্বর হয়ে ওঠে, নিজেদের অজান্তেই। ওদিকে আবদুল খালেকও কী প[আরে নিজের ভাবালুতাকে বেনোজলে ভাসিয়ে দিতে? স্ত্রী, শিশুসন্তান নিয়ে তার ছোট্ট সংসার, তারপরও নগ্ন বৈষয়িকতার রক্তচক্ষুর সামনে সন্ত্রস্ত থাকতে হয়। এতকিছুর পরেও তার ভেতরের পোকা মাঝেসাঝেই মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। স্ত্রীকে সে ভালোবাসে, কিন্তু সেই ভালবাসায় আটপৌরে সমস্যা সূঁচ হয়ে ঢোকে, আর ফাল হয়ে বেরুবার প্রাণপাত চেষ্টা করে। এই টানাপোড়েনে সে বিচলিত হয়, তার ভেতরটা পুড়ে খাক হতে থাকে, কিন্তু আর দশটা মানুষের মত সবদিক সামলে সুমলে চলার ব্যাপারে সে আনাড়িই থেকে যায়। রেখা ও আবদুল খালেকের এইসব ছোটখাট মান- অভিমানের ভেতর দিয়ে আবদুল খালেকের কল্পনাবিলাসী মন পাঠকের কাছে আরও গভীরভাবে ধরা দিতে থাকে এইভাবে-

রেখা আর টুকু, এই দুজনের জন্যে তার ভাবনা। নিজেকে সে বাদ দেয়; নিজেকে নিয়ে তার কোন সমস্যা নেই, কোনো না কোনোভাবে তার চলে যাবে।

এটাও একটা বাতুল চিন্তা, ফালতু ধারণা। আবদুল খালেক শুধরে নেয় নিজেকে, তার ভাবনা -চিন্তায় ওদের ভূমিকা যেন নিছক বোঝার। এর ভেতরে আচ্ছন্নভাবে তার একটা অহমিকা আছে, সে চালাচ্ছে ওদের। কে কাদের চালায়, আসলে তো যে যার নিজের জীবনকে নিজেই চালায়। চালানো মানে জিবনটাকে কোনমতে টেনে বেড়ানো। চেয়ে-চিন্তে, মেরে-কেটে, যেভাবেই হোক।


উপন্যাসের দ্বিতীয়াংশ শুরু হয় অনেকটা আচমকা, "আলো ছায়ায় যুগলবন্দি" শিরোনামে। রেখা ও খালেকের টানাপোড়েন এখানে অনেকটা থিতিয়ে পড়ে, তারা সহসা আবিষ্কার করে, তাদের সম্পর্কের গাঁথুনি পলকা নয় মোটেই। কিন্তু চমকে উঠতে হয়, যখন হঠাৎ পাঠক আবিষ্কার করে, দেশভাগের সময় পোকার ঘরছাড়ার সেই স্মৃতি আবদুল খালেককে আজতক ফেরারি হয়ে তাড়া করে, আর কোন এক আলটপকা মুহুর্তে ছাইচাপা আগুনের মত বেমক্কা জ্বলে ওঠে। পাঠক ধাক্কা খায়, যখন মনিভাইজান ছবিদির কাছ থেকে বিদায় নেয়। আর সেই যে সুর কেটে যায়, আর আবদুল খালেকের সারাটা জীবন বেসুরো হয়ে যায়; পোকা হয়ে সেই হারানো সুরের হদিস ঝুঁজে ফেরে সে,জনমভর।

No comments:

অন্ধের স্পর্শের মতো চলে গেলেন শঙ্খ ঘোষ

 সব কবিদের গদ্য সুন্দর হয় না। কেউ কেউ আছেন যাদের দুই হাতে একসঙ্গে বাজে কবিতা আর গদ্যের যুগলবন্দি। শঙ্খ ঘোষের গদ্যই সত্যিকার অর্থে পড়েছিলাম আ...