Monday, August 16, 2010

অপোগণ্ডের হাস্যপরিহাস

কেন হাসি, এককথায় এ প্রশ্নের জবাব দেওয়া মুশকিল। হাসি জিনিসটা মানুষের মজ্জাগত, এ নিয়ে যেমন সংশয় নেই ,ঠিক তেমনি এটা ভয়ানক রকম সংক্রামকও বটে। বেমক্কা কারো হাসি চলে আসলে সেই হাসি চেপে রাখতে যে হ্যাপাটা পোহাতে হয় সেটা আশা করি অনেকেরই জানা আছে। উচ মাধ্যমিক পরীক্ষার একদিন আমাদের হলে টহল দিচ্ছিলেন একজন বুড়োমত শিক্ষক। যে কোন কারণেই হোক, তিনি আমাদের রেজিস্ট্রেশন কার্ডটি বারবার খতিয়ে দেখছিলেন। তাই স্বাক্ষর করতেও বেশ বিলম্ব হচ্ছিল তার। একসময় আমাদের এক ফচকে বন্ধুর কার্ডটি চেক করার সময় তিনি একবার ছবির দিকে, ফের বন্ধুটির দিকে চাইছিলেন। বোধকরি, ছবির সাথে বাস্তবের খোমার গরমিল দেখে তিনি বিভ্রান্ত হয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু হঠাৎ বলা নেই,কওয়া নেই ,বন্ধুপ্রবর বিকট স্বরে হল কাঁপিয়ে হেসে উঠল। আমরা তখন লেখাটেখা ছেড়ে কান্ড দেখছি। এদিকে, শিক্ষক মশাই পুরোপুরি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলেন। পরে বন্ধুটি বলেছিল,হঠাৎ করেই নাকি তার এমন বেমক্কা হাসি পেয়ে যায়।


মজার ব্যাপারটা হল, এই হাসিটা কিন্তু বলে কয়ে আসেনা।এটা একটা খুবই প্রচলিত ধারণা, খুব মজার কিছু হলেই মানুষ হাসে। কিন্তু আদপে আমরা [ ঘটনাগুলো থেকেই হাসির রসদ খুঁজে নিই। খুব সাধারণ কথাবার্তাতেই মানুষ হেসে থাকে সবচেয়ে বেশি। মানুষ কথা বলার আগে থেকেই তার মুখে হাসি ফুটেছিল, সেটা গবেষণাতেই বের হয়ে এসেছে। তাই হাসি একেবারেই স্বতঃস্ফূর্ত একটা ব্যাপার, একারণে এর রসায়ন নিয়ে খানাতল্লাশি করতেও জেরবার হতে হয়(বাংলা ছিনেমার মুহাহা মার্কা হাসি বাদ দিলে, একমাত্র ডিপজল এ হাসি স্বতঃস্ফূর্তভাবে দিতে পারে)। আর সবচেয়ে বড় কথা হল, ব্যাপারটা আমাদের মেজাজের ওপর হাসির রকমসকম বেশ কিছুটা নির্ভর করে। একারণে দম ফাটানো কোন কৌতুকও বরাত মন্দ থাকলে অবস্থাভেদে মাঠে মারা যায়। আপনি হয়তো একটি জোকস বলে আসর মাত করে ফেলেন, অথচ অন্যদিকে অন্য জায়গায় আপনার জোকসটি হয়ে গেল বিলকুল ফ্লপ। আমাদের এক বন্ধু ছিল, প্রায়ই আমাদের বিভিন্ন কৌতুক বলে হাসানোর কোশেশ করত। আদি রসাত্মক থেকে শুরু করে সবধরনের কৌতুকই তার স্টকে দেদার ছিল। কিন্তু কদিন পরেই ব্যাপারটা বিষম রুপ নিল। একই বাঁধাগতের কৌতুক বলে আর কত লোক হাসানো যায় ? শেষমেষ যেই সে এসে বলত, দোস্ত ,আজকে একটা ব্যাপক জোক্স আছে। কথাটা নিষ্ঠুর শুনাবে, তবে আমরা তখন তাকে বেরসিকের মত থামিয়ে দিয়ে বললাম, আগে বল,কোন জায়গায় হাসতে হবে। কদিন পরেই বন্ধুটি লোক হাসানোর প্রজেক্টে ইস্তফা দিল।

তবে আমার ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ, উইটি ব্যক্তিরা তাদের উইট নিয়ে খুবই সজাগ থাকেন। যেখানে সেখানে তো নয়ই, বরং বেশ বাছবিচার করে তারা এই উইটের ভাঁড়ার থেকে রয়েসয়েই খরচ করেন। এক্ষেত্রে পরিমিতিবোধের ব্যাপারটাও খুবই প্রাসঙ্গিকভাবে চলে আসে। কখন থামতে হবে সেটা না জানলে ,শেষমেষ হিউমারের বারোটা বেজে যেতে বাধ্য। সরল বাংলায় আমরা এটাকে বলে থাকি ছ্যাবলামি। তবে সোনায় সোহাগা হয়ে উইটের সাথে যদি আরেক ডব্লিউ,উইসডম যোগ হয়। পাণ্ডিত্যরস তখন সেই রসবোধকে দান করে স্নিগ্ধ আমেজ। সৈয়দ মুজতবা আলী,তপন রায় চৌধুরী নাম এক্ষণে না নিলে তাই গোস্তাকি হবে। তবে কথাটা একটু মোটা দাগের হয়ে যাবে, তারপরও বলি, সব বড় লেখকই কমবেশি রসবোধ নিয়ে জন্মান। কারো লেখায় সেটা প্রকটভাবে ফুটে ওঠে,কারো লেখায় সেটার প্রচ্ছন্ন আভাস পাওয়া যায়, আর কেউ হয়তো সচেতনভাবেই সেটাকে আড়াল করে রাখেন।

তবে কেলোটা বাধে ভীষণভাবে যখন কেউ জোকার খেতাব পেয়ে বসে। সে বেচারা তখন যাই বলে, বা যাই করে,মানুষ অবলীলায় হেসে গড়িয়ে পড়ে। কোন বিশেষ কসরত ব্যতিরেকেই সে হাসিয়ে আসর মাত করে দিতে পারে। এই ক্ষমতাটা যে স্রষ্টাপ্রদত্ত,সে কথাও অস্বীকার করার জো নেই। তার দু;খেও মানুষ তখন হাসে,সুখে তো বটেই। মুশকিল হল, এই তকমা একবার গায়ে এঁটে গেলে সেটাকে খসানোতেও কম বেগ পেতে হয়না। একেবারে আনকোরা লোকজনও যদি নির্বিবাদে তার সাথে ঠাট্টা তামাশা করে, তবে কারই বা ভাল লাগে বলুন?

শুনেছি,রবিবাবু বলে গিয়েছেন, হাস্যরসের পূর্বশর্ত কাউকে না কাউকে একটু ছোট হওয়া। হাসি ঠাট্টার ক্ষেত্রে তাই ভিকটিম থাকতেই হবে।আমাদের বন্ধুমহলে প্রায়ই টিটকারী,ব্যাঙ্গ,বিদ্রুপ আকছার চলে,কিন্তু বেশির ক্ষেত্রে এর শিকার হয় আমাদের সবচেয়ে গোবেচারা বন্ধুটি। সমস্যাটা হল ,মাঝে মাঝেই সম্মিলিত তোপের মুখে পড়ে তাকে একটু বেশি রকম নাকাল হতে হয়। আদতে, কারো আছাড় খাওয়ার ঘ্টনা কিন্তু খুব একটা সুখপ্রদ ব্যাপার নয়। কিন্তু এরকম উটকো আছাড় খেতে দেখলে আমরা প্রায়শই হেসে ফেলি, সেটাও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই উচ্চস্বরে। আবার আছাড়ের থেকে ব্যাপারটা যদি গুরুতর পর্যায়ে চলে যায়, তবে সেখানে ঠাট্টা তামাশা আর চলেনা, তখন কেউ হাসলে তাকে আমরা বিকারগ্রস্তই গণ্য করি। তাই হাসানোর ব্যাপারে যেমন সংযম আবশ্যক, ঠিক তেমনি কখন হাসি থামাতে হবে সেটা বুঝার মত মুরোদও থাকতে হবে বৈকি।

No comments:

অন্ধের স্পর্শের মতো চলে গেলেন শঙ্খ ঘোষ

 সব কবিদের গদ্য সুন্দর হয় না। কেউ কেউ আছেন যাদের দুই হাতে একসঙ্গে বাজে কবিতা আর গদ্যের যুগলবন্দি। শঙ্খ ঘোষের গদ্যই সত্যিকার অর্থে পড়েছিলাম আ...