Saturday, August 14, 2010

৩৫ বছর আগের একদিন

১.

এই শুক্রবারটা গড়পড়তা অন্য দিনের মত ছিলনা,সেদিন ঢাকার এক নিভৃত কানাগলিতে কোন অনাহুত আগন্তুককে দেখে নেড়িকুত্তারা সশব্দে ঘেউ ঘেউ করে ওঠেনি, হকারের উচ্চকিত কোরাসে ঐ গলি প্রকম্পিত হয়ে ওঠেনি, সামনের রাজপথের রিকশাগুলো বেপথু হয়ে একটা দুটো কানাগলির সামনে এসে গোত্তা খায়নি, তবে মির্জা আসলাম ঠিকই গোসল সেরে ফুরফুরে মেজাজে বেরিয়েছিলেন। সুপুরুষ এই তরুণের প্রিয় পোশাক পাঞ্জাবি,বনেদী কাঠের আলমারি খুলে তার সদ্য খলিফাপাড়া থেকে সেলাই করা সফেদ পাঞ্জাবি গায়ে চড়িয়ে দেন। স্বভাববিপরীত ব্রীড়া ঝেড়ে ফেলে আয়নায় নিজেকে দেখার লোভটাও সামলাতে পারলেননা, গর্বোদ্ধত ভঙ্গিমায় নিজেকে দেখলেন,নাহ! পাঞ্জাবিতে আসলেই তাকে দারুণ মানায়। মাথাটা আঁচড়িয়ে যেই টুপিটা হাতে নিলেন, আচমকা একটি অযাচিত খবর তাকে বাকরুদ্ধ করে দিল। শোকস্তব্ধ আসলাম ধীরে ধীরে পাঞ্জাবিটা খুলে ফেলেন, তারপর যন্ত্রচালিতের মত আলগোছে রেখে দেন বিছানার পাশে। সেই নতুন বানানো পাঞ্জাবি তিনি আর ভুলেও ধরে দেখেননি।

২.

গড়পড়তা মানুষের তুলনায় আসলাম সাহেবের উচ্চতা কিছুটা বেশিই । এই প্রৌঢ বয়সেও এই গৌরবর্ণের মানুষটিকে ব্যক্তিত্ত্বের ছটার জন্যে আলাদাভাবে ঠিকই নজর কেড়ে নেন তিনি। সরকারি চাকুরির প্রলম্বিত জীবন শেষে এই কিছুদিন হল তিনি অবসরে গিয়েছেন। চাকুরীর পাট চুকানো হয়ে গিয়েছে, ছেলেমেয়েরাও এখন বেশ লায়েক, পড়াশওনা শেষে তারা টাকাও কামাচ্ছে মন্দ না। ছোট ছেলেটাতো মাত্র কিছুদিন আগেই নতুন চাকুরীতে যোগ দিল। এর মধ্যে পয়লা মাইনের অর্থে সে সবার জন্য উপহারও কিনে ফেলেছে এন্তার। এমনিতে আসলাম সাহেব মানুষটা একটু সৌখিন গোছের। কর্মজীবনেও তিনি ধোপদুরস্ত থাকতে পছন্দ করতেন। চেহারার জৌলুসের কারণে তাকে সব পোশাকেই কমবেশি মানিয়ে যেত। এখন তার বয়স গড়িয়েছে, তবে এটুকু শখ আহ্লাদ এখনো পুরোপুরি বিসর্জন দেননি তিনি। ছেলেদের কাছ থেকে মর্জিমত উপহার পেলে এখনো তিনি বেজায় খুশি হন। এদিকে তার গিন্নি আবার বুড়ো বয়সে সাজপোশাকের এই খোকাটে বাইয়ের জন্য ঠাট্টা করতে ছাড়েননা। তিনি অবশ্য এসবের থোড়াই কেয়ার করেন,কাপর চোপড়ে টিপটপ থাকার চেষ্টা করেন, মায় তাঁর আটপৌরে লুঙ্গি দেখলেও সদ্য পাটভাঙ্গা বলে ভ্রম হতে পারে। আশেপাশের মানুষজনও তাঁর এই বাতিকগ্রস্ততা সম্পর্কে অল্পবিস্তর জানে।

শুক্রবার। আসলাম সাহেব সময় থাকতে গোসলটা সেরে নিলেন, খানিক বাদেই জুমার নামাজের জন্য মসজিদে যেতে হবে। এসব কাজে তিনি তাড়াহুড়ো একদমই পছন্দ করেননা। তাছাড়া এই বয়সে আগের মত চটপটে হয়ে থাকাটাও হ্যাপার ব্যাপার। তাই সবকিছুর জন্য একটু আলাদা সময় এখন বরাদ্দ রাখতেই হয়। ড্র্রয়ার থেকে সদ্য ধোয়া লুঙ্গি আর ইস্ত্রি করা সাদা হাফশার্টটা গায়ে জড়িয়ে নিলেন।

এমন সময় তাঁর ছোট মেয়ে অনুযোগের সুরে জানতে চাইল,"বাবা, আবার এই সাদা শার্ট কেন? ভাইয়া কালকে যে পাঞ্জাবিটা এনেছে সেটা একদিন পড়লে কীইবা এমন হয় ? "

আসলাম সাহেব মৃদু হাসলেন,"মা,তুই কী জানিস না, আমি শুক্রবার দিন কখনো পাঞ্জাবি পরিনা।"

সত্যিই তো, একে একে পয়ত্রিশটি বছর কেটে গেল,এর মধ্যে তিনি একবারের জন্যও কোন শুক্রবারেই পাঞ্জাবি গায়ে চড়াননি। ৩৫ বছর আগের মধ্যআগস্টের সেই শুক্রবারের ফেরারী স্মৃতি তাঁকে এখনো তাড়া করে ফেরে, চোখ মুদলেই সেদিনকার সেই সফেদ পাঞ্জাবিতে তিনি লাল লাল ছোপ দেখতে পান...তার আর পাঞ্জাবি পরা হয়না....।

5 comments:

Anonymous said...

ভালো হইছে। অনেক দিন পর তোমার লেখা পড়লাম। শোকের দিনে চমৎকার গল্প।


শেষের পড়া মনে হয় পরা হবে

অম্লান মোসতাকিম said...

টাইপো :(.
লেখা পড়ার জন্য অনেক ধইন্যা ।

Fuad Naser said...

আমাদের রুমমেটকে পড়ানো উচিত, যদি সে ধরতে পারে আর কি!

পথভ্রষ্ট বালক said...

Valo laglo...

Besh valo!

অম্লান মোসতাকিম said...

খাড়া,রুমমেটরে পড়ামু @আবির।

@ আসিফ, ধইন্যা।

অন্ধের স্পর্শের মতো চলে গেলেন শঙ্খ ঘোষ

 সব কবিদের গদ্য সুন্দর হয় না। কেউ কেউ আছেন যাদের দুই হাতে একসঙ্গে বাজে কবিতা আর গদ্যের যুগলবন্দি। শঙ্খ ঘোষের গদ্যই সত্যিকার অর্থে পড়েছিলাম আ...